দ্বিতীয় দিনেও ডুয়েটে ঢুকতে পারেননি ভিসি
দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে ছাত্রশিবিরের এ আন্দোলন: ছাত্রদল
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৮:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
গাজীপুরে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) উপাচার্যের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের একাংশের আন্দোলন চলছে। এদিকে গতকাল সোমবার আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনেও নতুন উপাচার্য (ভিসি) ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেননি।
গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের একাংশ বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় তারা নতুন উপচার্যের নিয়োগ বাতিল ও সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছেন ডুয়েট শাখা ছাত্রদল ও ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’। দাবি আদায় না হলে ক্যাম্পাসে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরুর হুঁশিয়ারিও উচ্চরণ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ছাত্রদলের নেতারা বলেন, আগের উপাচার্যের অনিয়ম ও দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীর লেবাসে শিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরাই এ আন্দোলন করছে।
এ ছাড়া ডুয়েট শিক্ষক সমিতি বলছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তাদের সমর্থন আছে। ডুয়েট শাখা ছাত্রশিবির বলছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যৌক্তিক।
গতকাল আন্দোলন চলাকালে নবনিযুক্ত উপাচার্যকে প্রত্যাহারের দাবির সঙ্গে আন্দোলনকারীরা নতুন করে দুটি দাবি যুক্ত করেছেন। ডুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আমান উল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন দুই দাবির কথা জানান। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ডুয়েটের প্রধান ফটকের পাশে শহীদ মিনারের পাশে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা আমান উল্লাহ বলেন, ‘যে উপাচার্য আমাদের ভাইদের রক্ত ঝরিয়েছেন, আমরা তাঁকে চাই না। অনতিবিলম্বে তাঁর নিয়োগ বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও সহপাঠীদের ওপর সংঘটিত হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে জড়িত শিক্ষার্থীদের স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে।’
একই বিভাগের ছাত্র হাসানুর রহমান দাবি আদায় না হলে শাটডউন কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেন। বিকেলে ডুয়েটের প্রধান ফটকের বাইরে সংবাদ সম্মেলন করেন ডুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি জামিরুল ইসলাম জামিল ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির। এ সময় তারা বলেন, আগের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জয়নাল আবেদীনের সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই শিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা এ আন্দোলন করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের লেবাসে তারা এ আন্দোলন করছে।
অভযোগ বিষয়ে ডুয়েট শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আব্দুল আহাদ সমকালকে বলেন, এটা রাজনৈতিক কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের আন্দোলন নয়। একটি যৌক্তিক আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরাই বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরিষ্কার করেছেন।
এর আগে দুপুর দেড়টার দিকে উপচার্যের হলরুমে সংবাদ সম্মেলন করেন ডুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে আমরা সহমত। গত ৫ মে শিক্ষক সমিতির জরুরি এক সভায় আমরা সিদ্ধান্ত নিই– ডুয়েটের শিক্ষকদের মধ্য থেকেই যেন উপাচার্য দেওয়া হয়। এ সংক্রান্ত একটি আবেদনও আমরা মন্ত্রণালয় ও সচিবের কাছে পাঠিয়েছি।’ শিক্ষকদের উস্কানিতেই শিক্ষার্থীরা পাঁচ দিন ধরে আন্দোলন করছে– এমন অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে খসরু মিয়া বলেন, কোনো শিক্ষক কখনও ছাত্র-ছাত্রীকে এমন ইন্ধন বা উস্কানি দিতে পারেন না।
ডুয়েটে ঢুকতে পারেননি উপাচার্য
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল সকাল ৯টার দিকে ঢাকা থেকে গাজীপুরে যান উপাচার্য মোহাম্মদ ইকবাল। তবে তিনি ডুয়েট ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেননি।
গাজীপুর জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলছে, গতকাল দুপুরে উপাচার্য জেলা সার্কিট হাউসে যান। বেশ কিছু সময় সার্কিট হাউসে ছিলেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডুয়েটের এক শিক্ষক জানান, নতুন উপাচার্য ডুয়েট ক্যাম্পাসের আশপাশেই কোনো এক বাসায় অবস্থান করে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের দায়িত্বশীল আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সদরদপ্তরেও গিয়েছিলেন উপাচার্য। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে যান তিনি। সেখানে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ বিষয়ে জানতে মোহাম্মদ ইকবালের মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি বলেন, ‘আমি একটা মিটিংয়ে আছি। পরে কথা হবে।’ তারপর বারবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
গত রোববার সকালে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল ডুয়েটে যোগদান করতে যান। এ সময় রক্তক্ষয়ী ত্রিমুখী সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে পুলিশ পাহারায় পাশের উপজেলা পরিষদে গিয়ে তিনি আশ্রয় নেন। সেখানে বসে শিক্ষকদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি মিটিং করেন।
দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলছে, রোববার রাত ১২টা পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন। ডুয়েটের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. আবু তৈয়ব জানান, আগের উপাচার্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন নিয়মানুযায়ী দায়িত্ব হস্তান্তর কাগজে সই করেন। পরে সেই কাগজ নতুন উপাচার্যের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি সই করে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
গত রোববার সকালে ডুয়েটে নবনিযুক্ত উপাচার্য মোহাম্মদ ইকবালের যোগদানকে কেন্দ্র করে ত্রিমুখী সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ডুয়েট ক্যাম্পাস। ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, রোববারের সংঘর্ষের ঘটনায় ২৫০ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে পুলিশ। যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় ক্যাম্পাস এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে।
গত বৃহস্পতিবার ডুয়েটের উপাচার্য হিসেবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবালকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এর পরপরই তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীদের একাংশ।
- বিষয় :
- ডুয়েট
