ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বনরক্ষীর গুলিতে জেলের মৃত্যু

বনবিভাগের রেঞ্জ অফিসে হামলা-ভাঙচুর, ২৪ ঘণ্টায়ও হয়নি মামলা

বনবিভাগের রেঞ্জ অফিসে হামলা-ভাঙচুর, ২৪ ঘণ্টায়ও হয়নি মামলা
×

ভাঙচুরের পর সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়। ছবি: সমকাল

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ১৯:০৩ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১৯:০৯

কাঁকড়া শিকার করতে সুন্দরবনে গিয়ে বনরক্ষীদের গুলিতে আমিনুর রহমান নামে এক জেলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে স্থানীয় গ্রামবাসীদের হামলা, ভাঙচুরসহ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও এখনও কোনো মামলা হয়নি। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওচিত্র ঘেঁটে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে হামলার ঘটনার আগে গাবুরা ইউনিয়ন যুববিভাগের সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত ফেসবুক লাইভে এসে সবাইকে বনবিভাগের রেঞ্জ অফিসে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। 

প্রায় সাত মিনিটের বক্তব্যে তিনি ঘোষণা দেন, ‘আমিনুর হত্যার বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমরা বনবিভাগের অফিসের সামনে লাশ নিয়ে অবস্থান করবো।’ 

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে জানা যায়, বেলা ১১টার দিকে লোকজন গাবুরার ডুমুরিয়া, দৃষ্টিনন্দন ও চাঁদনীমুখা পয়েন্টে জড়ো হতে শুরু করে। বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে ১০-১২টি ট্রলারযোগে প্রায় পাঁচ শতাধিক গ্রামবাসী আমিনুরের মৃতদেহ নিয়ে গাবুরা হতে নদী পার হয়ে নীলডুমুর খেয়াঘাটে পৌঁছায়। এ সময় দাতিনাখালী এবং বুড়িগোয়ালিনী এলাকা হতে আগত আরও তিন/চারশ মানুষ ট্রলারে আসা গ্রামবাসীদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে রেঞ্জ অফিসের দিকে এগিয়ে যায়। 

একপর্যায়ে রেঞ্জ অফিসের সামনের রাস্তায় লাশ রেখে তারা সেখানকার সীমানা প্রাচীর ভাঙচুর ও সেখানে স্থাপনকৃত জিআই পাইপগুলো খুলে নিয়ে রেঞ্জ অফিসের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

নীলডুমুর গ্রামের আব্দুল মালেক ও ফয়সাল হোসেনসহ স্থানীয়রা জানান, রেঞ্জ অফিসে ঢুকে হামলাকারীরা জিআই পাইপ দিয়ে সিসি ক্যামেরাগুলো ভেঙে দেয়। এ সময় তারা রেঞ্জ অফিসের নিচতলার ব্যালকনি ছাড়াও রেঞ্জ কার্যালয়ের গ্রিল, জানালা, গেট ভেঙে ফেলে। 

স্থানীয়দের ভাষ্য এবং বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হামলার স্থানে জামায়াত ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। গাবুরা ইউনিয়ন যুববিভাগের আহ্বায়ক ইয়াছিন আরাফাত ছাড়াও গাবুরা ইউনিয়ন জামায়াতের ৯ নং সোরা এলাকার দায়িত্বশীল আবিয়ার রহমান, গাবুরা ইউপির ৯ নং ওয়ার্ড সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জু গাজী, জামায়াত কর্মী রবিউল ইসলাম জোয়ারদার, ইউনিয়ন যুবদল নেতা রিপন হামলার সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন। এ সময় ঘটনাস্থলে আরও উপস্থিত ছিলেন গাবুরা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির দিদারুল আলম, গাবুরা ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলমসহ তাদের কর্মী-সমর্থকরা।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান জানান, হামলাকারীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে প্রবেশ করেই ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এ সময় হামলার সঙ্গে জড়িতরা রান্নাঘরে ঢুকে প্লেট, পিরিচ, গামলাসহ সবকিছু ভেঙে দিয়ে চাল, ডালসহ রান্নার বেশ কিছু উপকরণ লুট করে নিয়ে যায়।  

বনবিভাগের এ কর্মকর্তা আরও জানান, বনরক্ষীর গুলিতে জেলের মৃত্যুর ঘটনা খুলনা রেঞ্জে ঘটেছে। অথচ হামলা, ভাঙচুরসহ লুটপাট করা হলো সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয় ও পাশের স্টেশন অফিসে। 

ঘটনার পেছনে অনেক বড় ষড়যন্ত্র রয়েছে দাবি করে তিনি আরও জানান, হামলাকারীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে ঢুকে বনবিভাগের যাকে সামনে পেয়েছে তাকেই পিটিয়েছে। আহত তার পাঁচ স্টাফের মধ্যে মেজবাহ উদ্দীনের দুই হাত ভেঙে গেছে। এছাড়া মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা ফয়জুর রহমানের মাথার হাড় ভেঙে ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা পাঠানো হয়েছে। 

রেঞ্জ কার্যালয়সহ স্টেশন অফিসে হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। 

যুববিভাগের সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত বলেন, বনরক্ষীরা দীর্ঘদিন ধরে বনজীবীদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। যে কারণে তার প্রতিবেশী গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করায় তিনি আবেগ সামলাতে না পেরে ফেসবুকে লাইভ করেছিলেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তিনি হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।

মাসুদুল আলম জানান, উত্তেজিত লোকজনকে ফিরিয়ে আনতে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। নিজের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে তিনি হামলাকারীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা চালান।

শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ খালেদুর রহমান জানান, বনবিভাগ মামলা করবে বলে জানালেও মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত কোনো অভিযোগ দেয়নি। এছাড়া জেলে নিহতের ঘটনায় তার পরিবার খুলনা জেলার কয়রা থানায় মামলা করতে গেছে।

নিহত শ্যামনগর উপজেলার বনজীবী আমিনুর রহমানের ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার বিকাল চারটার দিকে তার মৃতদেহ উপজেলার ৯ নং সোরা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। 

বনরক্ষীর গুলিতে নিহত বনজীবী আমিনুর রহমানের পরিবারের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। 

মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে তিনি সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মোঃ মনিরুজ্জামানের মাধ্যমে ভিডিও কলে আমিনুরের স্ত্রী ছকিনা খাতুনের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় প্রতিমন্ত্রী নিহত বনজীবীর পরিবারকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে যথাযথ তদন্তপূর্বক দোষী বনকর্মীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। 

নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ড. মোঃ মনিরুজ্জামান স্ত্রীসহ পাঁচ সন্তান রেখে যাওয়া বনজীবী আমিনুরের পরিবারের জন্য বাসযোগ্য একটি বসতঘর নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। 

এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ডাকসু নেতা অধ্যাপক আবু সাঈদ, মাসুদুল আলম, সোলায়মান কবির, শেখ লিয়াকত আলী, গোলাম আলমগীর, শহীদুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, আজিজুল সরদার প্রমুখ।

একইভাবে উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দল নিহত আমিনুরের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। বিএনপি নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পরপরই ১৫/১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নিহত আমিনুরের বাড়িতে পৌঁছায়। এ সময় পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারানো অসহায় মানুষগুলোর জন্য নগদ সহায়তা প্রদান করেন। 

অন্যান্যদের মধ্যে উপজেলা জামায়াতের মিডিয়া বিভাগের প্রধান মাওলানা আব্দুল হামিদ, পৌর জামায়াতের আমির হারুন-অর-রশিদ সাচ্চুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলগণ উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

×