ধান মাড়াই-শুকানোর জায়গা নেই, তাই রাস্তায়
আজিজুল হক সরকার, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৮:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী-মধ্যপাড়া-রংপুর এবং ফুলবাড়ী-পুখুরীহাটসহ সব ব্যস্ত মহাসড়ক-আঞ্চলিক সড়কগুলো এখন কৃষকদের ধান মাড়াই ও খড় শুকানোসহ চাতালে পরিণত হয়েছে। বোরো মৌসুমে শ্রমিক সংকট ও মজুরি বাঁচাতে বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক নিজের বাড়ির উঠান ছেড়ে গ্রামের পাকা রাস্তা ও সড়কে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এসব কাজে কৃষকের সড়কে যাওয়া রোধে গ্রামভিত্তিক সমবায়ী খলা বা একাধিক পরিবারভিত্তিক ‘মিনি চাতাল’ ব্যবস্থা তৈরিতে জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলার এলুয়াড়ী, দৌলতপুর, আলাদীপুর, শিবনগর ও খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, মাঠ থেকে কাটা ধান এনে রাস্তার ওপর ত্রিপল বিছিয়ে শুকানো হচ্ছে। কোথাও ধান মাড়াই মেশিন চলছে, আবার কোথাও পরিবারের সদস্যরা মিলে ধান উল্টেপাল্টে শুকাচ্ছেন। আকাশে মেঘ দেখলেই কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে উদ্বেগ।
উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর গাডিয়াতলা গ্রামের কৃষক সুপল মার্ডি জানান, বর্গা নিয়ে ৩ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। এমনিতেই উৎপাদন খরচ ওঠে না, আবার শ্রমিকের সংকট। সেজন্যই গ্রামের পাকা রাস্তায় ধান মাড়াই করে শুকাচ্ছেন তিনি।
বেতদিঘী ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের কৃষক ফজলার রহমান বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধইরা বৃষ্টিবাদল যাইতেছে। বাড়ির উঠান ও মাঠে ধান শুকাবার জায়গা নাই। তাই রাস্তার ওপরে ধান দিছি।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর ভুট্টা ও বোরো মৌসুম (মে-জুন) এই দুই মাস সড়কটিতে সড়কের আশপাশের গ্রামের কৃষকদের দখলে থাকে। সড়কটির ফুলবাড়ী থেকে মধ্যপাড়া পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে গত এক বছরে অর্ধশতাধিক অসংখ্য দুর্ঘটনায় হতাহতের শিকার হয়েছেন।
যানবাহন চালক মুন্না, মাসুম, মো. আলম বলেন, ধানের মৌসুমের ফুলবাড়ীর সবগুলো সড়ক-মহাসড়ক কৃষকদের দখলে চলে যায়। সড়কে ধান মাড়াই ও শুকানোর ফলে প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। অনেক সময় বাস-ট্রাকসহ ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে।
আলাদীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান দসিম উদ্দিনের দাবি, কৃষিপ্রধান এলাকায় সরকারি উদ্যোগে ইউনিয়নভিত্তিক আধুনিক মাড়াই কেন্দ্র ও ফসল শুকানোর উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা জরুরি। এতে কৃষকরা সড়কে ফসল মাড়াই ও শুকাতে নিরুৎসাহিত হবেন।
ফুলবাড়ীর স্বকল্প সোসাইটি ও এনজিও সমন্বয়কের নির্বাহী পরিচালক আব্দুল কাইয়ুম আনসারী বলেন, প্রতিবছর বর্ষার আগে মাটি ফেলে উঠান উঁচু করা, খলায় পানি বের হওয়ার
ড্রেন রাখলে এতে বাড়ির আঙিনাতেই নিরাপদে ধান-ভুট্টা শুকানো সম্ভব হবে।
সিসিডিবি– সমান আওয়াজ প্রকল্প ফুলবাড়ী উপজেলা এরিয়া ম্যানেজার মোছা. খাদিজা আক্তার বলেন, ধান, ভুট্টা ও গম মাড়াই এবং শুকানো সমস্যা সমাধানে প্রতিটি ইউনিয়ন বা গ্রামে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নিরাপদ কমিউনিটি ড্রাইং ইয়ার্ড ও মাড়াই কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য স্বল্প খরচে আধুনিক শুকানোর যন্ত্র ও সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করলে রাস্তায় ফসল শুকানোর প্রবণতা কমবে।
ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, গ্রেইন ড্রায়ার (শস্য শুকানোর যন্ত্র) ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃষকদের স্বল্প মূল্যে/প্রণোদনার মাধ্যমে এসব যন্ত্রের ব্যবস্থা করতে হবে। রাস্তায় ফসল শুকানো এড়াতে উঠান বৈঠক বা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সচেতন করা যেতে পারে। চাতাল মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ধান শুকানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ফুলবাড়ী সড়ক উপবিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আমান উল্লাহ আমান বলেন, কৃষকরা সড়কে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজ করায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। বারবার নিষেধ করার পরেও তারা শুনতে চায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
থানার ওসি আ. লতিফ শাহ বলেন, স্কুল মাঠ, ঈদগাহ মাঠ বা পরিত্যক্ত সরকারি জায়গা মৌসুমভিত্তিক কৃষকদের শুকানোর কাজে ব্যবহারের সুযোগ দিলে তারা রাস্তায় যাবে না। কৃষকরা যাতে সড়কে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজ না করেন সে বিষয়ে তাদের বুঝিয়ে বলা হবে।
ইউএনও আহমেদ হাসান বলেন, কৃষকরা কিছুটা নিরুপায় হয়ে রাস্তায় ধান, ভুট্টা বা খড় শুকানোর কাজ করে। বৈরী আবহাওয়া ঝড়বৃষ্টি, উঠানের স্বল্পতা ও শ্রমিক সংকটে অনেক কৃষক বাধ্য হচ্ছে। বৃষ্টিপাত না হলে, মাঠ শুকনো থাকলে কৃষকরা অধিকাংশ ধান মাঠেই শুকিয়ে ফেলতেন। তবে পরিবারভিত্তিক ছোট ‘মিনি চাতাল’ দুই-তিন পরিবার মিলে একটি ছোট শুকানোর প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে গ্রামভিত্তিক সমবায়ী খলা তৈরি করা যেতে পারে। এতে সড়ক-রাস্তার ওপর চাপ কমবে।
- বিষয় :
- ধান
