ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

টাঙ্গাইলে দুর্ঘটনা

কষ্টের উপার্জনে স্ত্রী সন্তানের জন্য জামা কিনেছিলেন তারা

কষ্টের উপার্জনে স্ত্রী সন্তানের জন্য জামা কিনেছিলেন তারা
×

টাঙ্গাইলের যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তে রডবোঝাই ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। ছবি: সমকাল

আব্দুর রহিম, টাঙ্গাইল

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ১৫:৫৭ | আপডেট: ২৫ মে ২০২৬ | ১৬:০২

কেউ দুই মাস, আবার কেউ তিন মাস পরিবার থেকে দূরে। দেশের বিভিন্ন জেলায় দিনমজুর, ফেরিওয়ালা ও নির্মাণশ্রমিকের কাজ করছিলেন তারা। ঈদ সামনে রেখে কষ্টের উপার্জনে স্ত্রী-সন্তানদের জন্য কিনেছিলেন নতুন জামা, খেলনা। কথা ছিল পরিবারের সঙ্গে ঈদ করবেন। কিন্তু বাড়ি ফেরার সেই যাত্রাই হয়ে উঠল শেষ যাত্রা।

টাঙ্গাইলের যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তে রডবোঝাই ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০ জন। সোমবার ভোরে যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তের সরাতৈল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ও আহতদের অধিকাংশই ছিলেন বিভিন্ন জেলার শ্রমজীবী মানুষ, যারা ঈদ উপলক্ষে কাজ শেষে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরছিলেন।

চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও আশপাশের এলাকায় কাজ শেষে তারা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ফিরছিলেন একটি রডবোঝাই ট্রাকে করে। ট্রাকের ভেতরে ছিল লোহার অ্যাঙ্গেল বার। তার ওপর ত্রিপল বিছিয়ে গাদাগাদি করে বসেছিলেন প্রায় ৩০ জন শ্রমজীবী মানুষ। কেউ ছিলেন দৈনিক মজুরির শ্রমিক, কেউ ফেরি করে ছোটখাটো পণ্য বিক্রি করতেন।

টাঙ্গাইলে দুর্ঘটনায় পড়া রডবোঝাই ট্রাক। ছবি: সমকাল

আহত তরিকুল ইসলাম বলেন, তারা চারজন রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়ার জন্য দুপুড় দেড়টার দিকে চট্টগ্রামের অলংকার মোড়ে দাঁড়িয়েছিলেন। চট্টগ্রামে দৈনিক ভিত্তিতে তারা শ্রমিকের কাজ করেন। ঈদ উপলক্ষে পরিবার পরিজনের জন্য কেনাকাটা করে তারা বাড়ি ফিরছিলেন। দুপুর দুইটার সময় তারা চারজনে দুই হাজার তিনশত টাকা মিটিয়ে ট্রাকে উঠেন। ট্রাকে লোহার এঙ্গেল বার ছিল। তার উপরে ত্রিপল বিছানো ছিল। ট্রাকটি বিকাল সাড়ে ৫টা সময় ফেনি এসে পৌঁছায়। এসময় সেখান থেকে আরও ২২জন মানুষ উঠায়। আবার ঢাকা থেকেও আরো চারজন ট্রাকে উঠে। সবাই গাদাগাদি করে এঙ্গেল বারের উপরে বসা ছিলাম। ঢাকা পার হওয়ার পর আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। ট্রাকটি কখন উল্টে যায় বুঝতে পারিনি। পরে দেখি আমি হাসপাতালে।

নওগাঁর মান্দা থানার আব্দুল রহমান বলেন, তারা ১৮ জন নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে লেস-ফিতা, শিশুদের খেলনা কানের দুলসহ নানা জিনিসপত্র ফেরি করে বিক্রি করেন। প্রায় দুইমাস আগে তারা বাড়ি থেকে বেগমগঞ্জ এসে ব্যবসা করে পরিবারের সাথে ঈদ করার জন্য বাড়ি ফিরছিলেন। 

তিনি বলেন, বিকেল সাড়ে ৫টার সময় তার ফেনী থেকে প্রতিজনে ৩৫০ টাকা ভাড়া মিটিয়ে ট্রাকে উঠেন। ফেনী থেকে ট্রাক আসার সময় ট্রাক চালক রাস্তায় তিনবার গাড়ি থামান। আমরা নেমে চা বিস্কুট খাই। গাজিপুর আসার পর ঘুমের ভাব হচ্ছিল। ভোরে টাঙ্গাইল ছাড়ার পর অনেকেই ঘুমিয়ে পড়ে। এলেঙ্গা পাড় হওয়ার কিছুক্ষন পর কিছু বুঝে উঠার আগেই ট্রাকটি মহাসড়কের পাশে উল্টে যায়। আমি ছিটকে পড়ি। যারা ঘুমিয়ে ছিল তারা অনেকেই রডের নিচে পরে যায়। পরে পুলিশ ও লোকজন এসে উদ্ধার করে হাসপাতালে এনে আমাকে ভর্তি করে।

ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয়রা উদ্ধারকাজ চালিয়ে আহতদের টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরা শ্রমিকদের অনেকেই এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না, কয়েক ঘণ্টার পথ কীভাবে তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতিতে পরিণত হলো।

আরও পড়ুন

×