ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৪৭০ বছরের কেল্লাপোশী মেলা মাছ-মিষ্টিতে ‘জামাইবরণ’

৪৭০ বছরের কেল্লাপোশী মেলা মাছ-মিষ্টিতে ‘জামাইবরণ’
×

ছবি: সংগৃহীত

 শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ১৩:৪১

মেলায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বিশাল আকারের রুই, কাতলা, বোয়াল ও আইড় মাছের সারি। বগুড়ার বিখ্যাত দই, রসমালাই, কালোজাম ও নানা ধরনের মিষ্টির দোকানগুলোতে দেখা যায় উপচে পড়া ভিড়। মাছের মতো দেখতে বড় আকারের মিষ্টি কিনতে চলে ক্রেতা-বিক্রেতার দামাদামি। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মাছ ও মিষ্টি দিয়ে জামাইকে বরণ করলে পারিবারিক সম্পর্ক আরও মধুর হয়।

গতকাল সোমবার বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কেল্লাপোশী মেলায় দেখা যায় মাছ ও মিষ্টির এমন সমাহার। ৪৭০ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্য স্থানীয়দের কাছে ‘জামাইবরণ মেলা’ নামেও পরিচিত। তিথি অনুযায়ী প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠের দ্বিতীয় রোববার থেকে উপজেলা সদরের অদূরে কেল্লাপোষী স্থানে এই মেলা বসে। তিন দিনব্যাপী মেলার আয়োজন থাকলেও চলে সপ্তাহ ধরে। মেলা উপলক্ষে শ্বশুর-শাশুড়িরা জামাইদের দাওয়াত করে বাড়িতে এনে মোটা অঙ্কের টাকা সালামি দেন। নিমন্ত্রণে আসা মেয়ে-জামাইদের সঙ্গে নিয়ে ছাতা, মিষ্টি, লুঙ্গিসহ নানা উপহার কিনে দেওয়া এখানকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, মেলায় দশ থেকে বিশ কেজি ওজনের নানা ধরনের মাছ উঠেছে। দোকানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বাদশাভোগ, সাজ বাদশা, কমলাভোগ, কালোজাম, চমচম, কাটি মিষ্টি, ফলমন, ক্ষীরমোহন, রসগোল্লা, দুধকলা, লাড্ডু, জিলাপি, ছানার জিলাপি, পানি তাওয়াসহ হরেক রকম মিষ্টান্নসামগ্রী। মাছ ও মিষ্টি ব্যবসায়ীরা প্রতিবারের মতো এবারও মেলায় এসেছেন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
বগুড়ার কাহালু থেকে আসা সাথী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী উত্তম ঘোষ জানান, মিষ্টির ব্যবসায় নাম লেখানোর পর থেকেই এই মেলায় মিষ্টি বিক্রি করতে আসেন। মাছ আকৃতির দুই থেকে চার কেজি ওজনের মিষ্টি প্রতিকেজি ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

আরেক মিষ্টি দোকানি পার্থ সাহা বলেন, সর্বনিম্ন ১৬০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকা কেজি দরে মিষ্টি বিক্রি হচ্ছে তাঁর দোকানে। প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার মিষ্টি বিক্রি হয়। 
মেলা উপলক্ষে প্রতিবার নিমন্ত্রণ পান জামাই সোহানুর রহমান সান, ফারুক হোসেন এবং কাওছার আহমেদ। তারা বলেন, শ্বশুর-শাশুড়ির পক্ষ থেকে সালামি দেওয়া হয়। সেই সালামির টাকা ও নিজের গচ্ছিত টাকায় সাধ্যানুযায়ী মাছ ও মিষ্টি কিনে শ্বশুরবাড়িতে ফিরি। 

মাছ ব্যবসায়ী আলমাছ মিয়া জানান, তাঁর দোকানে যমুনা নদী, চলনবিল এবং জলাশয়ের বড় বড় রুই, কাতলা, বোয়াল, পাঙাশ, মৃগেল, সিলভার কার্প, বিগহেডসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আছে। পাঁচ থেকে দশ কেজি ওজনের মাছের চাহিদা বেশি। এই ওজনের প্রতি কেজি কাতলা মাছ ৬০০-৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আরেক ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমান বলেন, তাঁর দোকানে একটি কাতলা মাছের ওজন পনেরো কেজি। দাম হাঁকা হয়েছে আঠারো হাজার টাকা। ক্রেতারা তেরো থেকে চৌদ্দ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বলেছেন।

১৫৫৬ সাল থেকে কেল্লাপোশী মেলা বসছে বলে জনশ্রুতি আছে। অনেকে বলেন, বৈরাগ নগরের বাদশা সেকেন্দারের একজন ঔরশজাত পুত্র এবং একজন দত্তক পুত্র ছিল। ঔরশজাত পুত্রের নাম গাজী মিয়া ও দত্তক পুত্রের নাম কালু মিয়া। গাজী মিয়া দেখতে খুবই সুদর্শন ছিলেন। তারা রাজ্যের মায়া ত্যাগ করে ফকির সন্ন্যাসীর বেশ ধরে ঘুরতে ঘুরতে ব্রাহ্মণ নগরে আসেন। গাজীকে দেখে মুগ্ধ হন ব্রাহ্মণ রাজমুকুটের একমাত্র কন্যা চম্পা। এক পর্যায়ে তারা একে অপরকে ভালোবেসে ফেলেন।

আরও পড়ুন

×