সরকারি সহায়তার তালিকায় নেই ক্ষতিগ্রস্তরা, মানবেতর জীবনযাপন
মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘীর হাওর পারে এখনও ধান সংগ্রহের চেষ্টায় স্থানীয় বোরোচাষি সমকাল
মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৭:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলতি বোরো মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার জেলার ছোট-বড় অন্তত ১৫টি হাওরের ফসল তলিয়ে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। হাকালুকি, কাউয়াদীঘি, হাইলসহ জেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন প্রায় ৫০ হাজারের বেশি কৃষক পরিবার।
যে সময় কৃষকদের ঘরে নতুন ধান তোলার ব্যস্ততা থাকার কথা, সেই সময় অনেককেই দেখা যাচ্ছে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা কিংবা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি মানবিক সহায়তার তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ– ইউনিয়ন পর্যায়ের কিছু উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে প্রস্তুত করা তালিকায় প্রকৃত কৃষকের বদলে স্বজন, অকৃষক, প্রবাসী এমনকি দীর্ঘদিন কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো কৃষক এখনও সরকারি সহায়তার বাইরে রয়েছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বর্গাচাষিরা। তারা অন্যের জমি চাষ করে পুরো বছরের জীবিকা নির্বাহ করেন। ফসল হারিয়ে এখন অনেকেই পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলার কেওলার হাওরের কৃষক মো. আনোয়ার খান বলেন, এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছিল। কিন্তু কাটার আগেই সব ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ঋণ করে চাষ করেছিলাম, এখন সেই ঋণ শোধ করব কিভাবে বুঝতে পারছি না। তালিকায় অনেক প্রকৃত কৃষকের নাম নেই। আমরা সঠিক তদন্ত চাই।
কুলাউড়া উপজেলার হাকালুকি হাওরের কৃষক আলী মিয়া বলেন, বোরো ধানই আমাদের একমাত্র ভরসা। এবার কোনো ফসল ঘরে তুলতে পারিনি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রকাশ করা হোক, যেন প্রকৃত কৃষকরা সহায়তা পায়।
রাজনগর উপজেলার কৃষক আব্দুল করিম বলেন, ‘আমরা মাঠে ফসল হারিয়েছি, এখন তালিকাতেও হারিয়ে যাচ্ছি। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে যদি তালিকা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?’
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার বিভিন্ন হাওরে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ২৭ হাজার ৪৬৩ জন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি টাকা। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে মাত্র ১২ হাজার কৃষকের জন্য সহায়তার অনুমোদন এসেছে, যা এখনও পুরোপুরি মাঠপর্যায়ে পৌঁছেনি।
অন্যদিকে কৃষক সংগঠন ও হাওর আন্দোলনের নেতাদের দাবি, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের মতে, জেলার হাওরাঞ্চলে অন্তত ৫০ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরেজমিন যাচাই ছাড়া প্রণীত তালিকায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই বাদ পড়েছেন।
মৌলভীবাজার হাওর রক্ষা আন্দোলন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আসম সালেহ সোহেল বলেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে বর্গাচাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়লেও তালিকায় তাদের অনেকেই স্থান পাননি। হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ বর্গাচাষি পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গেছেন। অথচ অনেক প্রকৃত কৃষকের নাম তালিকায় ওঠেনি। দ্রুত সঠিক জরিপ করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাবেল, হাওরে ফসলহানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বরাদ্দ পাওয়া সহায়তা দ্রুত বিতরণ করা হবে।
- বিষয় :
- ধান সংগ্রহ
