গোবিন্দগঞ্জ ওভারপাস
ছয় লেন প্রকল্পের সুফল যেখানে আটকা
লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ ক্রসিং। উত্তরাঞ্চলের ১০ জেলার সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের প্রধান করিডোর এটি। পাঁচ বছরের মধ্যে গোবিন্দগঞ্জ ওভারপাসের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এক দশকেও তা হয়নি। এ কারণে ঢাকা-রংপুর ছয় লেন মহাসড়ক প্রকল্পের সুফল থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত উত্তরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ। যানজটে পড়ে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনও কাজ শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত করতে পারেনি।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) সূত্র জানায়, দক্ষিণ এশীয় উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (সাসেক)-২ প্রকল্পের আওতায় টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত প্রায় ১৯০ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেন থেকে উভয় পাশে সার্ভিস লেনসহ ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। শুরুর সময় খরচ ধরা হয়েছিল ১১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ খরচ বেড়েছে প্রায় ৭ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ
গোবিন্দগঞ্জ অংশে যানজট এখন নিত্যদিনের ঘটনা। বিশেষ করে উৎসবে দীর্ঘ ছুটির সময় এই অংশে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। গোবিন্দগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আবদুল মালেক গত বুধবার সমকালকে বলেন, ধুলাবালি আর যানজটের কারণে ব্যবসা কমে গেছে। মানুষ দ্রুত এলাকা পার হতে চায়, বাজারে থামতে চায় না।
এই সড়কে নিয়মিত বাস নিয়ে চলাচল করেন চালক রহিম উদ্দিন। তাঁর ভাষ্য, ঈদযাত্রায় যানবাহনের চাপ বাড়লে ৫-৬ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের দুই পাশে মহাসড়ক সরু থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই তাদের যাতায়াত করতে হয়।
সওজ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ওভারপাসটি চালুর চেষ্টা চলছে। তবে মাঠপর্যায়ের কয়েকজন শ্রমিক জানিয়েছেন, এখানে কাজ পুরোপুরি শেষ হতে আরও প্রায় এক বছর লাগতে পারে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওভারপাসের কাঠামো নির্মাণের কাজ শেষ হলেও সংযোগ ও সড়ক উন্নয়নের কাজ এখনও প্রায় অর্ধেক বাকি।
সড়কটি যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ
সাসেক-২ প্রকল্পের আওতায় সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা ফ্লাইওভার, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী ফ্লাইওভার, গোবিন্দগঞ্জ ওভারপাসসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রেড সেপারেশন স্ট্রাকচার রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও জটিল অংশ হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ। এখানে একাধিক জাতীয় মহাসড়ক র্যাম্প ও ফ্লাইওভারের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে। এলেঙ্গা ও পলাশবাড়ীর ফ্লাইওভার আঞ্চলিক যান চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ। তবে গোবিন্দগঞ্জ ওভারপাসের দীর্ঘসূত্রতা পুরো করিডোরের গতি বাধাগ্রস্ত করছে। অন্যান্য অংশ প্রায় সম্পন্ন বা চালু হলেও একটি পয়েন্টের কারণে ছয় লেন মহাসড়কের সুবিধা পুরোপুরি মিলছে না।
কাজ পিছিয়েছে যেসব কারণে
গোবিন্দগঞ্জ ওভারপাস নির্মাণের শুরুতেই ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা দেখা দেয় বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে। তাদের ভাষ্য, অ্যাপ্রোচ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় জমির মধ্যে দোকানপাট, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থাপনা পড়ে যায়। জমিমালিকদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ, আপত্তি নিষ্পত্তি ও উচ্ছেদ কার্যক্রমে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এরপর নকশাগত পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। মহাসড়কে যানবাহনের চাপ, নিরাপত্তা ও সংযোগ সড়কের বিন্যাস বিবেচনায় ডিজাইনের কিছু অংশ সংশোধন করতে হয়। এতে পূর্বনির্ধারিত কাজের ধারা বাধাগ্রস্ত হয়। চার রাস্তার মোড় হিসেবে পরিচিত গোবিন্দগঞ্জ এলাকায় ঢাকা, রংপুর, দিনাজপুর ও মহিমাগঞ্জ সড়কের সংযোগস্থলে ফ্লাইওভার ও র্যাম্প নির্মাণকাজও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। মহাসড়কে যান চলাচল সচল রেখেই গার্ডার বসানো ও ভারী অবকাঠামোগত কাজ হওয়ায় কাজের গতি ধীর হয়। বিষয়টি সমন্বয় করতেও সময় লেগে যায়।
গাইবান্ধা সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিয়াস কুমার সেন বলেন, গোবিন্দগঞ্জ ওভারপাসের মূল কাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ। পিলার, গার্ডার ও ডেক স্ল্যাব নির্মাণও সম্পন্ন হয়েছে। অ্যাপ্রোচ রোডে মাটি ভরাট, সাব-বেজ ও বেজ কোর্স, ড্রেনেজ লাইন, গার্ডরেল, মিডিয়ান, সড়কবাতি স্থাপন ও কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে।
জাতীয় মহাসড়কের অংশ হওয়ায় এখানে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, যানবাহন চলাচল সচল রেখেই কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে জটিল ধাপ হলো বিদ্যমান মহাসড়কের সঙ্গে ওভারপাসের সংযোগ স্থাপন। প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের চলাচল বহাল রেখেই ট্রাফিক ডাইভারশন দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
প্রকল্পটির অতিরিক্ত পরিচালক অলিউর রহমানের ভাষ্য, জমি বুঝে পেতে দেরি হওয়ায় গোবিন্দগঞ্জে কাজ শেষ করতে সময় লাগছে। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। বাজারসংলগ্ন এলাকাগুলোতে যাতে জটলা না হয়, সেদিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
- বিষয় :
- প্রকল্প
