তিস্তার গর্জনে চরজুড়ে আতঙ্ক ভাঙনের শব্দে কাটছে রাত
ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে ভাঙনকবলিত তিস্তাসংলগ্ন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া এলাকা সমকাল
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীতে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদী ভাঙনের শব্দে চরাঞ্চলের মানুষের বুকে কাঁপন ধরেছে। নির্ঘুম রাতে তারা উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করেন, কখন কার ঘর যায় নদীর পেটে।
তিস্তার গর্ভে বিলীন হওয়া থেকে রক্ষা পেতে দিন-রাত নিজেদের সামান্য যা আছে তা সরিয়ে নিতে কাজ করছেন স্থানীয়রা। রাত জেগে বসে থাকেন যাতে ঘরের সঙ্গে তারা নদীতে ভেসে না যান। এ ছাড়া বসতঘর ও আসবাবপত্র সরিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চরবাসী।
গত তিনদিনে উপজেলার কাপাসিয়া, হরিপুর, বেলকা, চণ্ডিপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে শতাধিক বসতভিটা এবং তিন শতাধিক একর ফসলি জমিসহ রাস্তাঘাট নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে আরও তিন শতাধিক বসতভিটা, শত শত একর ফসলি জমি, বেশ কিছু শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন রোধে পাউবো কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই। লোক দেখানো কিছু কাজে কিছু স্থানে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হলেও তা তীব্র স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। ভাঙন প্রতিরোধে কোনো কাজেই আসছে না সেগুলো।
হরিপুর ইউনিয়নের কানি চরিতাবাড়ি গ্রামের মো. আবুল কাশেম মিয়া বলেন, গত তিন দিন ধরে ভারী বর্ষণের কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। গত ১০ বছর ধরে এখানে ভাঙন চলছে। চরের প্রতিটি মানুষের বসতভিটা এ পর্যন্ত অন্তত ৫ থেকে ৮ বার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে।
কছিম বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল হক জানান, তিস্তা নদী গতিপথ পরিবর্তন করে অসংখ্য শাখা নদীতে রূপ নিয়েছে। এর ফলে অসময়েও নদীভাঙন অব্যাহত থাকছে। স্থায়ীভাবে নদী শাসন ও ভাঙন রোধ করতে না পারলে চরের মানুষের কষ্ট কোনোদিন দূর হবে না।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া বলেন, তাঁর ইউনিয়নের লালচামার, ফুলমিয়ার মোড়, উজান বোচাগাড়ি ও ভাটি বোচাগাড়ি এলাকায় গত তিন দিন ধরে ব্যাপক ভাঙন চলছে। নিমেষের মধ্যে ফসলি জমি, বসতভিটা, গাছপালা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। ইউনিয়নের সবগুলো ওয়ার্ডই নদীর চরে। ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর কষ্টের সীমা নেই।
একই এলাকার বাসিন্দা ও বিএনপির সাবেক উপজেলা সভাপতি মোজাহারুল ইসলাম বলেন, নদী খনন, ড্রেজিং ও সঠিক নদী শাসন ছাড়া তিস্তার ভাঙন রোধ অসম্ভব। ড্রেজিং করে নদীর গতিপথ একমুখী করতে হবে, নয়তো এই উপজেলার মানচিত্রই পরিবর্তন হয়ে যাবে।
তিস্তার চরাঞ্চল এখন কৃষিতে একটি সম্ভাবনাময় জোন হিসেবে উল্লেখ করে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ধান, গম, ভুট্টা, বাদাম, কুমড়া, তরমুজ ও আলু চাষের জন্য তিস্তার বালুচর অত্যন্ত উপযোগী। কিন্তু প্রতিবছরের ভাঙন কৃষকদের স্বপ্ন ভেঙে দিচ্ছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। স্থায়ী ব্যবস্থা নিলে এই চরের কৃষকেরা দারুণভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সুন্দরগঞ্জে প্রতিবছর গড়ে ৫০০ বসতভিটা, ৬০০ হেক্টর ফসলি জমি, ৫০ কিলোমিটার রাস্তাঘাট এবং অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তিস্তায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
উপজেলা পিআইও মো. মশিয়ার রহমান বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর চেয়ারম্যানদের নিকট থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ সাপেক্ষে দ্রুত ত্রাণ বিতরণ করা হবে।
গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, নদী খনন, ড্রেজিং ও নদী শাসন ছাড়া তিস্তার ভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব নয়। আর স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সরকারের ওপর মহলের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন দেখা দিলে জিও টিউব ও জিও ব্যাগ ফেলা এবং ওপর মহলে তথ্য প্রদান করা ছাড়া এই মুহূর্তে আমাদের আর কিছু করার নেই।
সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমান বলেন, ‘বেশ কয়েকটি চরে ব্যাপক ভাঙনের খবর পেয়ে আমি ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছি। আপাতত জরুরি ভিত্তিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- নদী
