চমেক হাসপাতালে থ্যালাসেমিয়া শনাক্তের পরীক্ষা বন্ধ ২ বছর ধরে
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৮:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়লেও চট্টগ্রামে সরকারিভাবে এই রোগ শনাক্তের কোনো ব্যবস্থা নেই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগে প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ থ্যালাসেমিয়া শনাক্তের পরীক্ষা কার্যক্রম। এ কারণে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্বল্প আয়ের রোগীদের। অনেকেই থাকছেন চিকিৎসাসেবার বাইরে।
সরকারিভাবে ৬০০ টাকায় রোগটি শনাক্তে পরীক্ষা করার সুযোগ ছিল। বেসরকারি ব্যবস্থায় পরীক্ষার জন্য গুনতে হয় কয়েকগুণ বেশি টাকা। চিকিৎসকরা বলছেন, সরকারিভাবে রোগ শনাক্তের ব্যবস্থা না থাকায় আক্রান্ত হওয়ার পরও অনেকেই চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এতে জটিল হয় শারীরিক পরিস্থিতি। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসাদের প্রায় ৮০ শতাংশ গরিব ও কম আয়ের মানুষ। কয়েকগুণ টাকা খরচ করে বেসরকারি পর্যায়ে পরীক্ষা করানোর সামর্থ্য তাদের নেই। এ কারণে অনেকে মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
থ্যালাসেমিয়া শনাক্ত করতে রক্ত এবং জিনের কয়েকটি পরীক্ষা প্রয়োজন হয়। এজন্য এইচবি ইলেকট্রোফোরোসিস পরীক্ষা (রক্তের হিমোগ্লোবিনের ধরন এবং পরিমাপ বের করতে এই পরীক্ষা করা হয়) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া করতে হয় এইচপিএলসি পরীক্ষা। থ্যালাসেমিয়া ও অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন নিখুঁতভাবে নির্ণয় করতে এটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও উন্নতমানের পরীক্ষা। জেনেটিক পরীক্ষাও করতে হয়। থ্যালাসেমিয়ার জন্য দায়ী জিনে কোনো ত্রুটি বা মিউটেশন আছে কিনা, তা নিশ্চিত হতে এই ডিএনএ পরীক্ষাটি করা হয়। গর্ভের শিশুর থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা তা নির্ধারণ করতে প্রয়োজন হয় অ্যামনিওসেন্টেসিস পরীক্ষা (গর্ভের তরল পরীক্ষা)। এসব পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে চমেক হাসপাতালে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হেমাটোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. অখিল রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ‘প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে থ্যালাসেমিয়া রোগ শনাক্তের পরীক্ষা। বিষয়টি নিয়ে আমরাও বিব্রত। অত্যন্ত জরুরি এসব পরীক্ষা কার্যক্রম চালু করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বেশ কয়েকবার জানিয়েছি। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। সরকারিভাবে পরীক্ষা বন্ধ থাকায় আক্রান্ত রোগীর সঠিক তথ্য উঠে আসছে না। অনেকে থাকছে চিকিৎসার বাইরে।’
বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. অদিতি গোস্বামী বলেন, ‘প্রতিদিন নতুন অনেক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন বিভাগে।
তবে রোগ শনাক্তে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় তা করা যাচ্ছে না। এ কারণে বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলেন চিকিৎসকরা।’
চিকিৎসকরা জানান, থ্যালাসেমিয়া রোগ শনাক্তে বিভাগে নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, রি-অ্যাজেন্টসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা।
নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স। প্রায় দুই বছর আগে কিছুসংখ্যক রোগীর পরীক্ষা করার সুযোগ হয়েছিল। এরপর থেকে বন্ধ রয়েছে পরীক্ষা কার্যক্রম।
হেমাটোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী বলেন, ‘রক্তের লোহিত কনিকার অস্বাভাবিক ভাঙনজনিত এক প্রকার রক্তশূন্যতার রোগ থ্যালাসেমিয়া। রোগটি সংক্রামক না হলেও এটি পুরো সমাজকে সংক্রমিত করতে পারে। কারণ বংশপরম্পরায় এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বিস্তার লাভ করে। তাই আক্রান্তদের শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা সচল রাখতে নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন করতে হয়। তবে বেশির ভাগ মানুষ অনেকদিন পর জানেন যে তিনি রোগটিতে আক্রান্ত। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে নানা জটিলতা এড়ানো যায়। পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত দেরিতে হলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে জীবন।’
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে সাত বছরের মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে আসা দিনমজুর মো. রহিম উদ্দিন বলেন, ‘মেয়ের শরীরে একাধিক লক্ষণ থাকায় স্থানীয় এক ডাক্তারকে দেখিয়েছিলাম। তিনি চমেক হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। এখানকার চিকিৎসকরা দেখে থ্যালাসেমিয়া নিশ্চিত হতে পরীক্ষা করানোর পরার্মশ দেন। কিন্তু এখানে নাকি পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ। বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতাল-ল্যাবে গিয়েও পরীক্ষা করাতে পারিনি। কারণ এটি করতে প্রায় দুই হাজার টাকা প্রয়োজন। মাত্র ছয়শ টাকা নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলাম মেয়ের চিকিৎসা করাতে।’
থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী দেশে ৬০ থেকে ৮০ হাজার থ্যালাসেমিয়া রোগী আছে। সচেতনতার অভাবে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিয়ের আগে নারী-পুরুষের থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানো, নিয়মিত রক্তদান এবং ঢাকার বাইরে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের বিকল্প নেই বলে মনে করেন ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্টরা।
- বিষয় :
- চমেক