ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

হরমুজে আটকা ১১৫ দিন

‘বারবার মনে হচ্ছিল যদি মাইন বিস্ফোরণ হয়, কী হবে আমাদের’

‘বারবার মনে হচ্ছিল যদি মাইন বিস্ফোরণ হয়, কী হবে আমাদের’
×

বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ২১:৩৯ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ | ২১:৪৪

‘হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় বারবার মনে হচ্ছিল পরিবারের কথা। চোখের সামনে ভেসে আসছিল তাদের মুখ। জাহাজ এগিয়ে নিচ্ছিলাম। আর স্মরণ করছিলাম সৃষ্টিকর্তাকে। আরও তিনবার আমরা এই প্রণালি পার হতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। তখন হরমুজের কাছাকাছি এলেও যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে কখনোই পাড়ি দেওয়া হয়নি প্রণালি। বারবার মনে হচ্ছিল এখন যদি মাইন বিস্ফোরণ হয়, কী হবে আমাদের’– প্রায় চার মাস (১১৫ দিন) আটকে থাকার পর হরমুজ প্রণালি পাড়ি দেওয়ার অনুভূতি এভাবেই জানালেন ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজের অতিরিক্ত চিফ অফিসার প্রণয় কৃষ্ণ সেন। বাংলার জয়যাত্রা জাহাজ নিয়ে তিনিসহ ৩১ নাবিক ও ক্রু গত সোমবার রাত ৩টায় অতিক্রম করেন হরমুজ প্রণালির রেডজোন।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন জাহাজটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটকা পড়েছিল। আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পণ্য খালাস করতে গিয়ে জাহাজে থাকা ৩১ বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রু অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। তাদের জাহাজ থেকে ৫০০ মিটার দূরেই একটি মিসাইল হামলা হয় জেবেল আলী বন্দরের তেলের ডিপোতে। 

মার্চের শুরুতে ওই হামলার ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বাংলাদেশি জাহাজটির। তবে নাবিক ও ক্রুরা একটি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন আতঙ্কের মধ্যে। জাহাজে থাকা নাবিক ও ক্রুর সবাই সমুদ্রযাত্রায় অভিজ্ঞ হলেও এমন যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে আগে কখনোই পড়েননি তারা। 

প্রায় ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হন ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজের নাবিক ক্রুরা। এত দিন তারা পারস্য উপসাগরে একরকম বন্দিজীবন কাটিয়েছেন। 

এদিকে দেশে থাকা তাদের স্বজনরা কাটিয়েছেন উৎকণ্ঠার দিন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনও  বিষয়টি নিয়ে ছিল উদ্বিগ্ন । ইরানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তারা জাহাজটিকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার অনুমতি এনে দিতে পারেননি। চতুর্থ দফায় এবার মিলেছে সফলতা। নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে পেরেছে জাহাজটি।

সোমবার মধ্যরাতে খুদে বার্তা দিয়ে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদ মালেক জানান, ৩১ নাবিক ও ক্রু নিয়ে বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তারা সবাই সুস্থ আছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নৌ মন্ত্রণালয়কেও সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি। মাহমুদ মালেক বলেন, ‘পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা এমটি নর্ডিক পোলক্স নামে জাহাজটিও রোববার হরমুজ অতিক্রম করাতে পেরেছি। মাইনের ঝুঁকি এড়াতে বাংলার জয়যাত্রা জাহাজকেও ইরানের উপকূল ঘেঁষে চালাতে বলা হয়েছিল। তারা সেটি পেরেছে। তবে কোনো রেড সিগন্যাল পেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে গতিপথ পরিবর্তন করার সিদ্ধান্তে ছিলাম। ইরান থেকে তেমন কোনো বার্তা না আসায় হরমুজ অতিক্রমের ঝুঁকি নিয়ে সফল হয়েছি আমরা।’  

জাহাজে থাকা অতিরিক্ত চিফ অফিসার প্রণয় সেনও অভিন্ন মন্তব্য করেন। তিনিও এই প্রতিবেদককে সোমবার রাত সাড়ে ১২টায় হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা দিয়ে জানান, তারা হরমুজের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। রাত সাড়ে ৩টায় আরেকটি মেসেজ দিয়ে তিনি জানান, একটু আগে হরমুজ অতিক্রম করেছেন তারা। এখন আর ভয় নেই।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) হিসাব অনুযায়ী হরমুজের চার পাশে এখনও প্রায় এক হাজার ৬০০টি জাহাজ আটকে আছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন পরেই ইরান এই সংকীর্ণ জলপথটি বন্ধ করার পাশাপাশি তাদের অনুমতি ছাড়া এই পথ দিয়ে কারও যাওয়ার সুযোগ নেই বলে ঘোষণা দেয়। 

আরও পড়ুন

×