পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষোভে পানিতে ফেলছেন কৃষক
ছবি: সমকাল
ফরিদপুর অফিস
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ১৭:৪৫
ফরিদপুরের সালথায় ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় কৃষকরা উৎপাদিত পেঁয়াজ খাল, পুকুর ও ডোবার পানিতে ফেলে দিচ্ছেন। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অর্ধেকেরও নিচে নেমে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। এতে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
সম্প্রতি উপজেলার খোয়াড় গ্রামের একটি ডোবার পানিতে কৃষকদের পেঁয়াজ ফেলে দিতে দেখা যায়। এমন দৃশ্য স্থানীয়দের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, বর্তমান বাজারদরে পেঁয়াজ বিক্রি করার চেয়ে পানিতে ফেলে দেওয়া যেন কম কষ্টের।
পেঁয়াজ চাষি দাউদ মাতুব্বর বলেন, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদন করতে সার, বীজ, সেচ, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এরপর মৌসুম শেষে ঘরের চাঙ বা মাচায় সংরক্ষণ করতে হয়। পাঁচ-ছয় মাস পর সংরক্ষণের কারণে ওজন কমে এক মণ পেঁয়াজ প্রায় ৩০ কেজিতে নেমে আসে। সব মিলিয়ে লোকসান ছাড়া কিছুই থাকছে না।
শুধু সালথা নয়, ফরিদপুরের নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরাও একই সংকটে রয়েছেন। ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম কম থাকায় অধিকাংশ কৃষক লোকসানে পড়েছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করায় এখন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সালথার কৃষক আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয়। এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর পেঁয়াজ চাষ করবো কি না, সেটাই ভাবছি।
পাইকারি ব্যবসায়ীরাও বলছেন, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে গেছে। ফরিদপুর শহরের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহজাহান বেপারি বলেন, এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকেও প্রচুর পেঁয়াজ বাজারে আসছে। ফলে দাম কমেছে। তবে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাব এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতিবছরই পেঁয়াজের দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যায়। এর ফলে কখনও ভোক্তা, আবার কখনও কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েন।
এ বিষয়ে সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, চলতি মৌসুমে সালথা উপজেলায় পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর। তবে কৃষকদের আগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এ বছর উপজেলায় মোট প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের গড়ে প্রায় ২৪ টাকা খরচ হয়, অর্থাৎ প্রতি মণের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৯৬০ টাকা।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। কৃষকদের সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাজারমূল্য নির্ধারণ কৃষি বিভাগের হাতে নেই।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন বলেন, পেঁয়াজের দাম না থাকায় কৃষক কষ্টে আছেন, এটি সত্য। তারা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না বলে অবগত হয়েছি। বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ের হলেও আমি ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি তুলে ধরব, যাতে কৃষকদের স্বার্থে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তা দিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে ৭০০টি বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে পেঁয়াজ সংগ্রহ, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাবেন কৃষকরা, যা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
