ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

বন্দর ও কাস্টমসের সমন্বয়হীনতা গায়েব পণ্যভর্তি কনটেইনার

বন্দর ও কাস্টমসের সমন্বয়হীনতা গায়েব পণ্যভর্তি কনটেইনার
×

 সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস হাউসের সমন্বয়হীনতার সুযোগে গায়েব হয়ে গেছে সন্দেহভাজন পণ্যবোঝাই ২৫০টি একক কনটেইনার। চোরাচালান, পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা কিংবা শুল্ক ফাঁকির সন্দেহে এসব কনটেইনার লক করে রেখেছিল কাস্টমস হাউস। জাল সিল, ভুয়া স্বাক্ষর এবং গেট পাসের জাল নথিপত্র ব্যবহার করে বন্দর ও কাস্টমসেরই এক শ্রেণির কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব কনটেইনার খালাস করে জালিয়াতচক্র। 

এজন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দায়ী করছে বন্দরকে। অন্যদিকে বন্দর দায়ী করছে কাস্টমসকে। বন্দর বলছে, এসব কনটেইনারের বেশির ভাগ কাস্টমসকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কনটেইনারগুলো নিয়ে উভয়পক্ষ চিঠি চালাচালিও করছে। কিন্তু দায় নিচ্ছে না কেউই। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। তারা বলছেন, যাদের কাছে পণ্য সুরক্ষিত থাকার কথা তাদের কাছ থেকেই যদি তা গায়েব হয়ে যায় তাহলে কোথায় যাবেন তারা।

চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি ও সি কম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গায়েব হওয়া কনটেইনারের সংখ্যা নিয়ে দায়িত্বশীল দুটি প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে। কিন্তু একটি কনটেইনারও কেন গায়েব হবে বন্দর থেকে? এটির দায় তাদেরই নিতে হবে। 
কাস্টমসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (এআইআর) শাখার তথ্য অনুযায়ী, উধাও হয়ে যাওয়া কনটেইনারগুলোর মধ্যে ২০২১ সালের আছে ৮৩টি, ২০২২ সালের ৬১টি, ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের ৬৬টি রয়েছে। এই কনটেইনারগুলো লক করা থাকায় খালাস করার কোনো সুযোগই ছিল না। তদন্ত কর্মকর্তারা সরেজমিনে পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার পরই এসব চালান খালাস হওয়ার কথা। এ বিষয়টি জানিয়ে গত এক বছরে বন্দরকে চারটি চিঠিও দিয়েছে তারা। সর্বশেষ চিঠি দেওয়া হয় গত এপ্রিলে। এসব চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কনটেইনারগুলোর অবস্থানই খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। এজন্য চালানো যাচ্ছে না তদন্ত কার্যক্রমও। 
কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার তারেক মাহমুদ বলেন, বন্দরে সংরক্ষিত সমস্ত আমদানীকৃত কার্গো বা পণ্যের আইনি অভিভাবক হলো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আইনসম্মতভাবে খালাস বা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত পণ্য নিরাপদ হেফাজতের দায়িত্ব বন্দরের।

বিপরীত কথা বলছে বন্দর 
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে কাস্টমস এভাবে অনুমাননির্ভর তথ্য দিয়ে বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কাস্টমস কর্তৃক ২৫০টি লক করা পণ্যচালান গায়েবের কথা বললেও প্রকৃত পক্ষে এটির সংখ্যা ২৪৭টি। উক্ত পণ্যচালানগুলোর ১৬৪টির মধ্যে এফসিএল (ফুল কনটেইনার লোড) কনটেইনারের সংখ্যা ২৯৩ বক্স এবং অবশিষ্ট ৮৩টি পণ্যচালানে এলসিএল কার্গো রয়েছে। ওই ২৯৩ বক্স কনটেইনারের মধ্যে কাস্টমস আউট পাসের মাধ্যমে বন্দর থেকে ডেলিভারি হয়েছে ৮৮ বক্স কনটেইনার। আইজিএম ঘোষণা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রাইভেট ডিপোতে স্থানান্তর হয়েছে ৭০ বক্স কনটেইনার এবং চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে স্থিত রয়েছে ১৩১ বক্স কনটেইনার। এ ছাড়া প্রদত্ত পণ্য চালানে বর্ণিত ৪টি কনটেইনার নম্বর সঠিক ডিজিটভুক্ত নয়। 
বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, আলোচ্য সকল কনটেইনার/কার্গো কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে কাগজের মাধ্যমে হস্তান্তর করা আছে। বিষয়টি চিঠি দিয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

চুরি নিয়ে নতুন উদ্বেগ
লক করা কনটেইনার গায়েব হওয়ার আলোচনা যখন তুঙ্গে তখন সামনে এসেছে আবার ফ্যাব্রিক-বোঝাই তিনটি লোডেড কনটেইনার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের মালিক ব্যবসায়ী সেলিম রেজা জানান, তিনি কাস্টমসের একটি ইলেকট্রনিক নিলামের (ই-অকশন) মাধ্যমে ২৭ টন আমদানীকৃত ইনডিগো ফ্যাব্রিকের একটি কনটেইনার কিনে ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। অগ্রিম আয়কর, ভ্যাট ও অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে তাঁর খরচ হয় ১ কোটি ৬ লাখ টাকা। নিলামে অংশ নেওয়ার আগে কনটেইনারটি নিজে দেখে যাচাই করেন তিনি। কিন্তু ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি পণ্য খালাস নিতে বন্দরে গিয়ে আর কনটেইনারের হদিস পাননি। চার মাস পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ওই কনটেইনারটি না থাকার কথা স্বীকার করে। ওই ব্যবসায়ী এখন ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এই ক্ষতিপূরণ দিতে বলছে বন্দর কর্তৃপক্ষকে।  
এদিকে পণ্যবোঝাই আরও দুটি কনটেইনার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ আলাদা দুটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে। নগরীর হালিশহর এলাকা থেকে খালি অবস্থায় একটি কনটেইনার সম্প্রতি উদ্ধার করে বন্দর থানা পুলিশ। তবে সেখান থেকে হাওয়া হয়ে গেছে ভেতরে থাকা আনুমানিক ২ কোটি টাকা মূল্যের আমদানীকৃত ফেব্রিক। এই ঘটনায় পুলিশ দুই বন্দরের কর্মচারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। 

আরও পড়ুন

×