ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ইতালির পথ থামল হাঙ্গেরির জঙ্গলে

ইতালির পথ থামল হাঙ্গেরির জঙ্গলে
×

ফরিদুর রহমান বুলবুল

দাগনভূঞা (ফেনী) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:১৯

উন্নত জীবনের আশায় ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন ফরিদুর রহমান বুলবুল (৩৫)। দালালের কথায় দিয়েছেন ১৮ লাখ টাকা। কথা ছিল, বিমানে করে সরাসরি তাঁকে ইতালি নেওয়া হবে। কিন্তু কয়েক দেশ ঘুরে নেওয়ার পথে হাঙ্গেরির জঙ্গলে অসুস্থ হয়ে পড়েন বুলবুল। দেশটির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনি। গতকাল রোববার ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের বারাহীগেবিন্দ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায় তাঁর মৃত্যুর সংবাদ। এতে পুরো পরিবারে নেমে আসে শোকের আবহ। 

ফরিদুর রহমান বুলবুল বারাহীগেবিন্দ গ্রামের সফি ডাক্তার বাড়ি মৃত মফিজুর রহমানের ষষ্ঠ সন্তান। বছর সাতেক আগে তিনি বিয়ে করেন চাচাতো বোন কহিনুর আক্তার পলিকে। এই দম্পতির সংসারে ফারিহা নামের ৬ বছরের এক মেয়ে। বর্তমানে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা কহিনুর।

স্বজনেরা জানায়, আগে সৌদি আরবে থাকতেন ফরিদুর রহমান বুলবুল। কাজ করতেন একটি আবাসিক হোটেলে। বছরখানেক আগে দেশে ফেরার পর উন্নত জীবনের আশায় ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। এরই মধ্যে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ফেনী শহরের বিরিঞ্চি এলাকায় বাসিন্দা মো. দুলালের সঙ্গে। ইউরোপে মানুষ পাঠানোর দালালি করেন তিনি। দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনার পর ১৮ লাখ টাকার বিনিময়ে বুলবুলকে ইতালি পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। কয়েক দফায় চেক ও নগদে টাকা নেন দুলাল।

বুলবুলের ছোট ভাই কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এ বিষয়ে গতকাল রোববার কথা হয় সমকালের। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, গত ১৬ জুন ইতালির উদ্দেশ্যে বিমানে দেশ ছাড়েন বুলবুল। তাঁকে সরাসরি বিমানে সেখানে নেওয়ার কথা থাকলেও শুরুতে নেওয়া হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই। পরে পূর্ব ইউরোপের সার্বিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া হয়ে সড়কপথে বুলবুলকে নেওয়া হয় হাঙ্গেরিতে। ওই দেশের জঙ্গলে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। গুরুতর অবস্থায় তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে কয়েকদিন আগে মারা যান বুলবুল। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্থানীয় থানার মাধ্যমে এই সংবাদ পেয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। 

কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর ভাই বুলবুলের সর্বশেষ কথা হয় গত ২৪ জুন। সেদিন তিনি নজরুলকে জানিয়েছিলেন, দালাল মো. দুলাল যে কথা দিয়েছিলেন, তা রক্ষা করা হয়নি। সরাসরি বিমানে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে তাঁকে জানানো হয়েছে, বাসে বা ট্রেনে করে নেওয়া হবে। পরে ২৬ জুন আবারও বুলবুলের ইমু নম্বরে কল করেন তাঁর ভাই নজরুল। সেদিন তিনি অনলাইনে থাকলেও কল ধরেননি। আর কখনোই কথা হয়নি দুই ভাইয়ের। এর দুদিন পর ২৮ জুন ভাইয়ের খোঁজ নিতে ফেনীতে দুলালের বাড়ি যান নজরুল। সেদিন সঠিক তথ্য দেওয়া হয়নি তাঁকে। সপ্তাহখানেক পরে যেতে বলা হয়। পরবর্তী দফায় নজরুলকে দুলাল জানান, বুলবুল অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন। তখন নজরুল ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ার দাবি জানালে দুলাল বলেন, এখন কথা বলা যাবে না। দুয়েকদিনের মধ্যে বাসায় নেওয়া হবে, তখন কথা বলা যাবে। পরে দুলালকে আর ফোনে পাননি তারা। 

গতকাল রোববার সকালে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথমে বুলবুলের বিষয়ে তথ্য জানতে তাঁর পরিবারিক নম্বরে কল দেওয়া হয়। তাঁর বোন কল রিসিভ করলে কিছু তথ্য নিয়ে জানানো হয়, বুলবুল হাসপাতালে আছেন। কয়েক ঘণ্টা পরই দাগনভূঞা থানা পুলিশের একটি দল বাড়ি এসে পরিচয় যাচাই করার কাগজপত্র নিয়ে যান। তখনই তাদের কাছ থেকে মৃত্যুর তথ্য জানতে পারেন স্বজনেরা। এর পর থেকেই বাড়িজুড়ে কান্নার রোল পড়ে যায়। তাঁর ভাই নজরুলের আকুতি, যেভাবেই হোক ভাইয়ের লাশ যেন দেশে ফেরানো হয়। এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। পাশাপাশি যে দালালের কারণে এমন মৃত্যু হয়েছে, তাঁকেও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। 
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে দাগনভূঞার ইউএনও মো. শাহীদুল ইসলামের মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ধরেননি। দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম নোমান বলেন, নিহত যুবকের মরদেহ হাঙ্গেরিতে আছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তাদের কাছ থেকে বুলবুলের ঠিকানা সঠিক কিনা জানতে চেয়েছিল। পুলিশ সদস্যরা বাড়িতে গিয়ে ভেরিফাই করেন ও পরিবারকে বিষয়টি জানান।

আরও পড়ুন

×