জিও ব্যাগের এক-চতুর্থাংশই খালি
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন থেকে রক্ষায় ফেলা হচ্ছে বালুভর্তি জিও ব্যাগ। গতকাল বুধবার কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কাঁচকোল সড়কটারী এলাকায় -সমকাল
রিয়াদুল ইসলাম বাবু, চিলমারী (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০৩ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন রোধে জরুরি মেরামতের জন্য জিও ব্যাগে দেওয়া হচ্ছে নির্ধারিত পরিমাণের এক-চতুর্থাংশ কম বালু। এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা প্রায় এক কোটি আট লাখ টাকার এ কাজ দায়সারাভাবে করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। এ কারণে তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীর রক্ষা বাঁধের একই জায়গায় আবারও ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন গতকাল বুধবার দেখা যায়, উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কাঁচকোল সড়কটারী এলাকায় প্রায় ৩০ মিটার ব্লক ধসে রাস্তার একটি অংশ ভেঙে পড়েছে। এ ছাড়া প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা ঘুরে অন্তত সাতটি জায়গায় ধস ও ফাটল দেখা গেছে। এতে পুরো এলাকাই নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, জিও ব্যাগে শুধু বালু কম ভরাই নয় ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের জিও ব্যাগ। এমনকি প্যাকিংয়েও বিভিন্ন অনিয়ম করা হয়েছে। কোটি টাকার বরাদ্দের কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই আবারও বাঁধ ধসে পড়েছে বলে মন্তব্য তাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীর রক্ষা প্রকল্পের প্রথম কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালে। ওই বছরের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ফেজ-১ প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০০৯ সালের জুনে। ২০১২ সালের নভেম্বরে শুরু হয় ফেজ-২ প্রকল্পের কাজ। যা চলে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া ফেজ-৩ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের জুনে। এ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছিল ৩০২.৬০ কোটি টাকা। পরে প্রথম সংশোধনে মেয়াদ জুন ২০২৩ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তখন খরচ বাড়িয়ে ৪৪৮.৩১ কোটি টাকা করা হয়। চিলমারী অংশে পড়া এই ফেজের কাজ যৌথভাবে করছে অরিয়েন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড ও বি জে জিও-টেক্সটাইল লিমিটেড।
এলাকাবাসী জানায়, তিন সপ্তাহ আগে কাঁচকোল সড়কটারী এলাকায় তিনটি জায়গায় ভাঙন দেখা দিলে দুই দফায় ১৮ হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের জন্য প্রায় ৮১ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এরপর চলতি মাসে আরও ছয় হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ হয়। সব মিলিয়ে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ২৪ হাজার জিও ব্যাগ, এর জন্য বরাদ্দ হয় প্রায় এক কোটি আট লাখ টাকা।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, জিও ব্যাগে ২৫০ কেজি বালু ভরার কথা ছিল। কিন্তু অধিকাংশ জিও ব্যাগেই প্রায় এক-চতুর্থাংশ অংশ খালি রাখা হয়েছে। এসব ব্যাগ নদীতে ফেলা হলেও তীব্র স্রোতে বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ করতে পারছে না।
এরই মধ্যে গত সোমবার রাতে কাঁচকোল সড়কটারী এলাকায় প্রায় ৩০ মিটার ডানতীর রক্ষা বাঁধ ধসে পড়ে। নদীর ভাঙন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকলে আতঙ্কিত হয়ে উঠেন এলাকাবাসী। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সবাইকে যার যা আছে তা নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসার আহ্বান জানান। সহস্রাধিক মানুষ রাতভর জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করেন।
কাঁচকোল সড়কটারীর বাসিন্দা ফেলানী বেওয়া (৯০) বলেন, ‘যখন ব্লক ভাঙে, তখন আত্মা ছাইড়া যায়। শুধু আল্লাহ আল্লাহ করি।’ একই এলাকার বাসিন্দা ফরজ উদ্দিন (ডেস্কা) ব্যাপারী বলেন, গত সোমবার রাতে ভাঙনের তীব্রতা এতো বেশি ছিল যে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দিয়ে যার যা আছে তাই নিয়ে আসতে বলা হয়। হাজারের বেশি মানুষ রাতভর জিও ব্যাগ ফেলেছেন। কিন্তু এভাবে প্রতি বছর জরুরি মেরামত করলে হবে না। স্থায়ীভাবে ব্লক ডাম্পিং ও নদীর মাঝের ডুবোচর ড্রেজিংয়ের দাবি জানান তিনি।
এদিন কথা হয় রফিকুল ইসলাম, আবুল হোসেন, নূরজাহান বেগম, মিজানুর রহমান, ফুল বাবু, মতিয়ার রহমান, খতিব উদ্দিন ও মঞ্জু মিয়াসহ কয়েকজনের সঙ্গে। তারা জানিয়েছেন, ব্রহ্মপুত্রের ডানতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর কয়েক বছর স্বস্তিতে ছিলেন। এখন আবারও বারবার ধস দেখা দিচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতি বর্ষায় ভাঙনের আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। বাঁধটি ভেঙে গেলে হাজারো পরিবার আবারও নদীভাঙন ও বন্যার কবলে পড়বে। তাদের দাবি, জরুরি মেরামতের নামে বরাদ্দ হওয়ার টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জিও ব্যাগে নির্ধারিত পরিমাণ বালু ভরা হয়েছে কিনা ও কাজের মান ঠিক আছে কিনা, তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ‘ওই এলাকায় নতুন করে ছয় হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসে মোট ২৪ হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে।’ জিও ব্যাগে বালু কম ভরার অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর দাবি, ‘এমপি, ইউএনও এবং আমাদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে জিও ব্যাগের প্যাকিং পরীক্ষা করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাগে ২৫০ কেজির বেশি বালু থাকার কথা। অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি আবারও যাচাই করা হবে।’
তবে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘জিও ব্যাগের প্যাকিং পরীক্ষা করার সময় আমাদের কোনো প্রতিনিধিকে ডাকা হয়নি। বিষয়টি আমি দেখছি।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ধরেননি।