ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এখনও ‘কঙ্কাল’ গাজী টায়ার কারখানা

এখনও ‘কঙ্কাল’ গাজী টায়ার কারখানা
×

গাজী টায়ার কারখানা

 শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১৪ | আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

এক সময় যে কারখানায় দেশের যানবাহনে ব্যবহৃত বেশির ভাগ টায়ার উৎপাদন হতো সেটি এখন ‘কঙ্কাল’। কারখানার বেকার হওয়া সাড়ে ১২ হাজার শ্রমিকের অনেকেই অন্য প্রতিষ্ঠানে কম বেতনে চাকরি করছেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ার ও পাইপ কারখানা পুড়িয়ে দেওয়ায় দেশে গত দুই বছরে টায়ারের দাম অনেক বেড়ে গেছে। 

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে এই কারখানায় লুটপাট চালানো হয় এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর।  গত সোমবার দুপুরে রূপগঞ্জের খাদুনে গাজী টায়ার ও পাইপ ফ্যাক্টরির সামনে গিয়ে দেখা যায় গেট বন্ধ। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি গেটে উঁকিঝুঁকি মারছিলেন। গাজী টায়ারের প্রোডাকশন বিভাগের শ্রমিক ছিলেন তিনি। কারখানার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘এখন লাঞ্চের সময়। আপনি অনায়াসে গেটে দাঁড়িয়েছেন। যদি কারখানা খোলা থাকত তাহলে মানুষের ভিড়ে আপনি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন না। হাজার হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করত। কারখানায় আগুন লাগিয়ে দেওয়ার পর সবাই বেকার হয়ে গিয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি দুই মাস কাজে লাগতে পারিনি। অনেক কষ্টে সময় পার হয়েছে। এখন পাশের একটি কারখানায় কাজ করি। সব মিলিয়ে মাসে ১২ হাজারের মতো টাকা পাই। কিন্তু আগে পেতাম সব মিলিয়ে মাসে ২৫ হাজারের মতো। আমি গাজী টায়ারের প্রোডাকশনের ফিনিশিংয়ে কাজ করতাম। টায়ার বানানোয় দক্ষ ছিলাম। অনেকে টাঙ্গাইলে গিয়ে অন্য একটি টায়ার কারখানায় কাজ নিয়েছে। কিন্তু তারা আর কয়জনকে চাকরি দেবে?’ 

গাজী টায়ারের গেটে আটকালেন প্রহরী মোহাম্মদ রায়হান। বললেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে তিন-চারবার তাদের প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট হয়। ২৫ আগস্ট ও ৬ সেপ্টেম্বর দুইবার কারখানাটিতে ব্যাপক লুটপাট হয়। ২৫ আগস্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক গাজী গোলাম দস্তগীর বীরপ্রতীককে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিন রাত ১০টা থেকে মিছিল করে এসে শত শত মানুষ ব্যাপক লুটপাট শুরু করে। প্রথম দফা লুটপাটের পর একটি গ্রুপ এখানে আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুন লাগিয়ে দেওয়ার পর এখানে ১৮২ জন নিখোঁজ হয়েছে বলে দাবি করে তাদের আত্মীয়রা। ধারণা করা হচ্ছে, এ আগুনে লুটপাট করতে আসা আরেক গ্রুপের লোকজন পাঁচতলা ভবনে আটকা পড়ে। তারা নিচে নামতে না পেরে আগুনে পুড়ে মারা যায়। ১ সেপ্টেম্বর এই ভবনের ভেতর থেকে দেহের বিভিন্ন অংশের ১৫ খণ্ড হাড় পাওয়া যায়। দ্বিতীয় দফা লুটপাটের পর প্রশাসনের লোকজন ও মালিকপক্ষ এখানে প্রহরার ব্যবস্থা করে। তখন থেকেই মালিকপক্ষের অনুমতি ছাড়া কাউকে এখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না। কারখানায় ঢুকতে মালিকপক্ষের অনুমতি আনতে বললেন প্রহরী রায়হান। 

গাজী টায়ারের মালিক গাজী গোলাম দস্তগীর বীরপ্রতীক আওয়ামী লীগ আমলে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী এবং এই এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন। এলাকার একজনের সহযোগিতায় কারখানায় ঢুকে দেখা গেল শেডের পর শেড আগুনে পোড়া। যে পাঁচতলা ভবনে আগুনে পুড়ে অনেকে মারা গেছে বলে দাবি করা হয়, সেটিতে গিয়ে দেখা যায় কলামগুলো ফেটে গেছে। চারতলা ও পাঁচতলার ছাদ ধসে তিনতলায় পড়েছে। ২৬ একর ৭২ শতাংশ জমির ওপর বিশাল কারখানা এলাকা নীরব, নিস্তব্ধ। 

এই কারখানা পুড়িয়ে দেওয়ার পর টায়ারের দাম বেড়ে গেছে বলে জানালেন অনেকেই। ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক সুলতান মিয়া জানালেন, আগে রিকশার টায়ার কিনতেন ৪৮০ টাকা করে। একটা টায়ার ছয় মাস পর্যন্ত টিকত। এখন দুটি কোম্পানির টায়ার কেনেন ৫৬০ টাকা থেকে ৬০০ টাকায়। কিন্তু টেকে দুই থেকে তিন মাস। অনেক সময় এক মাস পরই টায়ার পাল্টাতে হয়।

আরও পড়ুন

×