টিকিট করেও ফেরা হলো না শ্যামলের, এখন লাশের অপেক্ষা
লাশের অপেক্ষায় নিহতের স্বজনরা। ছবি- সমকাল
বাগমারা (রাজশাহী) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৪৪
তিন মেয়ের মুখে হাসি ফোটাতে আট বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন রাজশাহীর বাগমারার শ্যামল উদ্দিন মাঝি (৪৬)। ঋণ করে বিদেশে গেলেও দীর্ঘ আট বছরে পরিবারের জন্য তেমন কিছুই করতে পারেননি তিনি। অবশেষে পরিবারের অনুরোধে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। আগামী শুক্রবার দেশে ফেরার জন্য বিমানের টিকিটও কেটেছিলেন। কিন্তু জীবিত আর ফেরা হলো না তাঁর। এখন পরিবারের অপেক্ষা লাশের জন্য।
রোববার রাতে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শ্যামল উদ্দিন। তিনি বাগমারা উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।
সোমবার সকালে শ্যামল উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। প্রতিবেশীরা এসে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। শ্যামলের স্ত্রী রশিদা খাতুন (৪২) মাঝেমধ্যে কান্নায় ভেঙে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন।
জ্ঞান ফিরতেই রশিদা খাতুন বলেন, ‘তোমার সঙ্গে হামার কালকেই কথা হলো। তুমি বাড়িত আসবে বললে, আর রাতে তোমার মরার খবর পানু।’ তিনি জানান, রোববার সকালে স্বামীর সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়। আগামী শুক্রবার দেশে ফেরার কথা ছিল শ্যামলের।
শ্যামলের বড় মেয়ের জামাই মিজানুর রহমান জানান, রোববার রাতে শ্যামলের এক সহকর্মী মুঠোফোনে তাঁর মৃত্যুর খবর দেন। তিনি বলেন, ওই সময় শ্যামলসহ অন্য শ্রমিকেরা কারখানায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁদের একজন শ্রমিক চুল কাটাতে সেলুনে যাওয়ায় আগুনের হাত থেকে বেঁচে যান।
মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৯ সালের ৭ ডিসেম্বর আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে শ্যামল সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দালালের প্রতারণার শিকার হন তিনি। কাজের বৈধতা না পাওয়ায় আট বছরে একবারও দেশে ফিরতে পারেননি। এত দিন পর প্রথমবারের মতো আগামী শুক্রবার দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁর।
তিনি আরও বলেন, ‘শ্বশুরের মৃত্যুতে আমাদের পরিবারটি একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছে। মেজো মেয়েটি এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তার ফলাফল ভালো হবে এমন আশা ছিল শ্যামলের।’
প্রতিবেশী ও সাবেক ঝিকড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, শ্যামল উদ্দিন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর তিন মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে, বাকি দুজন এখনো ছোট। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়েছে। সরকারের উচিত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো।
বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ নিহত শ্যামলের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে মরদেহ দেশে আনা এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।