ফ্যামিলি কার্ড নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ
গাইবান্ধায় ইউএনও কার্যালয়ে ভাঙচুর, তালা
ছবি: সমকাল
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৫৫
ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে তথ্য সংগ্রকারী ও সুপারভাইজর পদে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার গাইবান্ধার ফুলছড়িতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে। এর আগে নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থী ও বিএনপির নেতাকর্মীরা সেখানে বিক্ষোভ করেন।
একই অভিযোগে জেলার আরও তিন উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরগঞ্জে ইউএনও কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া গত সোমবার রাতে জেলার পলাশবাড়ী ও সাদুল্লাপুরে বিক্ষোভ মিছিল করা হয়।
ফুলছড়িতে অবস্থান থেকে ভাঙচুর
গত সোমবার বিকেলে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজর পদের নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। এর পর মঙ্গলবার দুপুরে ফুলছড়ি উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মী এবং উত্তীর্ণ হতে না পারা ব্যক্তিরা এই ফল বাতিলের দাবিতে ইউএনও কার্যালয় চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
তারা নিয়োগ পরীক্ষার ফল বাতিলের দাবিতে নানা স্লোগান দেন। এক পর্যায়ে উপজেলা পরিষদের দ্বিতীয় তলায় ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় ইউএনও কার্যালয়ের একটি কক্ষের জানালা এবং বারান্দায় থাকা চেয়ার ও ফুলের টব ভাঙচুর করা হয়।
ফুলছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জয়নাল মিয়া বলেন, আমি নিজেও সুপারভাইজর পদে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় নাম নেই। আমার দুবার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। গোটা উপজেলার সাত ইউনিয়নে মাত্র চার থেকে পাঁচজনকে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, প্রকাশিত ফলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামও রয়েছে। তাই ক্ষুব্ধ হয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও নিয়োগবঞ্চিতরা এই ঘটনা ঘটান। তিনি অবিলম্বে এই ফল বাতিলের দাবি জানান।
ফুলছড়ি থানার ওসি দুরুল হোদা বলেন, ভাঙচুরের ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ বা মামলা দায়ের হয়নি। এসব বিষয় জানতে ফুলছড়ির ইউএনও মোস্তাফিজুর রহমানের মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।
সুন্দরগঞ্জে ইউএনও কার্যালয়ে তালা
একই দিন দুপুরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ইউএনওর কার্যালয়ের মূল ফটকে এবং উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
এর আগে উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল উপজেলা সদরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে তারা সমাবেশ করেন। বিক্ষোভ শেষে তারা কার্যালয়গুলোয় তালা লাগিয়ে দেন। এ সময় বক্তারা ইউএনও এবং সমাজসেবা কর্মকর্তার বদলির দাবি জানান।
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মাহমুদুল ইসলাম প্রামাণিক বলেন, সমাজসেবা কার্যালয়ে কথা বলার জন্য গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি সপ্তাহে এক-দুই দিন মাঝেমধ্যে অফিসে আসেন– এমন কথা শুনে বিক্ষুব্ধ জনগণ সমাজসেবা কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেন। তিনি আরও বলেন, পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে আগে থেকেই তালা লাগানো। ফলে ভেতরে প্রবেশ করে কথা বলার সুযোগ না থাকায় বিক্ষুব্ধ জনগণ সেখানেও নতুন করে তালা ঝুলিয়ে দেন।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাবুল আহমেদ, সদস্য সচিব মাহমুদুল ইসলাম প্রামাণিক, পৌর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ইখতিয়ার উদ্দিন ভূঁইয়া লিপন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার হোসেন পপেল, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুর রহমান, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক আনোয়ারা, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মতিয়ার রহমান এবং উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ওয়ালি উজ্জামান মণ্ডল রিয়ালসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এ বিষয়ে ইউএনও ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, বিধি মোতাবেক কমিটির মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজরের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে কোনো প্রকার অনিয়ম হয়নি। তিনি আরও বলেন, ফল প্রকাশের পর বিক্ষোভকারীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সমাজসেবা দপ্তরের কোনো প্রকার অনিয়মের অভিযোগ করেননি। যোগাযোগও করেননি। গেটে তালা ঝুলানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পলাশবাড়ীতে সড়ক অবরোধ
গত সোমবার রাতে পলাশবাড়ী উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে ছাত্রদল।
উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক আরিয়ান সরকার আরিফ ও সদস্য সচিব সোহেল রশিদ হৃদয়ের নেতৃত্বে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এ কর্মসূচি পালন করেন। বিক্ষোভ মিছিল শেষে পলাশবাড়ী চৌমাথায় সড়ক অবরোধ করেন তারা। এতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীরা অংশ নেন।
বিক্ষুব্ধরা নিয়োগ কাজে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ মাসুদুর রহমান মোল্লার অপসারণের দাবি জানান।
উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক আরিয়ান সরকার আরিফ বলেন, সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সুপারভাইজর এবং তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের লোকজনকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এজন্যই আমরা নিয়োগবঞ্চিতদের পাশে থেকে তাদের পক্ষে বিক্ষোভ করেছি।
সাদুল্লাপুরে দুদিনের আলটিমেটাম
সাদুল্লাপুর উপজেলা সদরে সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিক্ষোভ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রদল। এর পর সেখানে অনুষ্ঠিত হয় পথসভা।
জানা গেছে, ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জন্য সুপারভাইজর ও তথ্য সংগ্রহকারী পদে নিয়োগে সাদুল্লাপুর উপজেলায় দুই দফা পরীক্ষা হয়। প্রথম দফা পরীক্ষা শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বদলিজনিত কারণে এখান থেকে চলে যান। গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক সাদুল্লাপুরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এর পর দ্বিতীয় দফা পরীক্ষা শেষে গত সোমবার বিকেলে ফল প্রকাশ করা হয়। এর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্নভাবে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
ইউএনও কার্যালয়ের সামনে পথসভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ইসতিয়াক আহমেদ সোহান ও সদস্য সচিব পারভেজ সরকার। তারা বলেন, আওয়ামী লীগ মনোভাবাপন্ন কর্মকর্তারা অনিয়ম আর দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে এই কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন। তাই এই ফল বাতিল করে নতুনভাবে ফের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তারা দুদিনের আলটিমেটাম দেন।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানাতে ইউএনওর সরকারি মোবাইল ফোন নম্বরে কল দিলেও সেটি রিসিভ করা হয়নি। পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জসিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্যার ভালো বলতে পারবেন।
সাদুল্লাপুর থানার ওসি একেএম হাবিবুল ইসলাম জানান, বিষয়টি তিনি সামাজিক মাধ্যমে দেখেছেন। এ নিয়ে ইউএনও কার্যালয় থেকে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রতিনিধিরা)