সীতাকুণ্ডে ৯ মৃত্যু
ছয় মাস আগে ধরা পড়ে গুরুতর তিন অনিয়ম
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় গত শুক্রবার এই জাহাজ কাটার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। গতকাল শনিবার তোলা সমকাল
চট্টগ্রাম ব্যুরো ও সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পুরোনো জাহাজভাঙার কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে উঠে এসেছে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে পদে পদে ছিল নিরাপত্তার ঘাটতি। ঝুঁকি নিরসনে ছিল না পূর্বপ্রস্তুতি; ছিল না পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম। গুরুতর আহত শ্রমিকদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা না দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাও করেছিল মালিকপক্ষ।
ছয় মাস আগেও নিরাপত্তা নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানে একই রকমের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। তাদের পর্যবেক্ষণেও গুরুতর তিনটি অনিয়ম ধরা পড়ে এই শিপইয়ার্ডের।
নিরাপত্তা নিয়ে অবহেলা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া, অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়েও শ্রমিকদের বাড়তি টাকা না দেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসের পরিদর্শনে। এসব কারণে জুলাই মাসে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় শ্রম আদালতে। এর পরও সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো এই ইয়ার্ডের কার্যক্রম যথাযথভাবে মনিটর না করায় গত শুক্রবার বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে প্রাণ গেল ৯ জনের।
মামলার বাদী এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের শ্রম পরিদর্শক শাহেদ পারভেজ সমকালকে বলেন, ‘গত ৯ ফেব্রুয়ারি কারখানাটি পরিদর্শন করে বেশ কিছু অনিয়ম দেখতে পাই। জুলাইয়ে শ্রম আদালতে মামলাও করা হয়। তারপরও টনক নড়েনি ইয়ার্ড মালিকের। এ কারণে এবার প্রাণ দিতে হলো ৯ জনকে।’
মামলায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি এখন বিচারাধীন বলে জানান তিনি।
মামলা করার পরও সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো এই প্রতিষ্ঠানকে কেন নজরদারিতে আনেনি– এমন প্রশ্নের জবাবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে কার গাফিলতি ছিল, কোথায় নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল, মামলা হওয়ার পরও কেন তাদের নিয়মের আওতায় আনা যায়নি সেগুলো খতিয়ে দেখব আমরা। সর্বশেষ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণও খুঁজে দেখবে তদন্ত কমিটি। এই কমিটির প্রতিবেদন পেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল জাহাজে
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাহাজের কার্গো ট্যাঙ্কের পাশে আছে ব্যালাস্ট এলাকা। জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য এখানে পানি রাখা হয়। এই জোনেই হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল। বিষাক্ত সেই গ্যাসে আক্রান্ত হয়েই একে একে মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। প্রথমে দুজন শ্রমিক ব্যালাস্ট এলাকায় অচেতন হয়ে পড়েন। পরে আরও দুজন যান সেই ট্যাঙ্কে। তারাও মূর্ছা যান। তখন তাদের উদ্ধার করতে যান অন্যরা। এভাবে একে একে ৯ জন বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। ইয়ার্ডের মালিকপক্ষ প্রথমে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এ জন্য বিষক্রিয়ায় আক্রান্তদের যথাসময়ে চিকিৎসাসেবা না দেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখছে তদন্ত কমিটি।
তদন্ত কমিটি যা বলছে
জাহাজের দুর্ঘটনাকবলিত অংশে কাজ শুরুর আগে সেখানে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছিল কিনা এবং কাজের জায়গাটি নিরাপদ ঘোষণা করার পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা তা খতিয়ে দেখছে তদন্ত কমিটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘ইয়ার্ডটিতে নিরাপত্তা ঘাটতি ছিল আগে থেকেই। সেটি নিয়ে মামলাও হয়েছে। তারপরও মালিকপক্ষ শোধরায়নি। যাদের এগুলো তদারক করার কথা, তাদেরও গাফিলতি আছে। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা এমন কিছু তথ্য পেয়েছি। এর বেশি কিছু এখন বলা যাবে না।’
ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে ‘এমটি রাসি’ নামে ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের স্ক্র্যাপ জাহাজে গত শুক্রবার প্রাণহানির এই ঘটনা ঘটে। এলএনজি পরিবহন করা জাহাজটি কাটতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দেয়।
ছয় মাস আগেই যে ঘাটতি পেয়েছিলেন পরিদর্শকরা
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর তাদের প্রতিবেদনে ছয় মাস আগেই উল্লেখ করে, ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসামগ্রী নেই। জাহাজভাঙার কাজে ঝুঁকি মূল্যায়ন করে নির্ধারিত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি তা দেয়নি। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিয়েও ছলচাতুরি করত কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা হলেও ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হতো। ওভারটাইম দেওয়া হতো না শ্রমিকদের। তখনও শুক্রবার ছুটির দিনে শ্রমিকদের কাজ করানোর অভিযোগ ছিল। মামলার বাদী জানান, এসব অনিয়ম পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিকে শোধরানোর সুযোগ দেওয়া হয়। পরপর দুটি নোটিশ পাঠান তারা। দেওয়া হয় কারণ দর্শানোর নোটিশও। কিন্তু দায়সারা জবাব দেয় ইয়ার্ড মালিক। তাই মামলার পথে হাঁটে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর।
যা বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা
শুক্রবার কোনো শ্রমিক কাজ করেননি বলে ইয়ার্ড মালিক প্রথমে দাবি করলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জাহাজের তলায় থাকা এলএনজি ট্যাঙ্ক কাটার কাজ করছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। একটি ট্যাঙ্কের চারপাশ কাটার ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর সেটি পুরোপুরি খোলার জন্য যান শ্রমিকরা। যারাই এর আশপাশে গেছেন, তারাই গ্যাসের বিষক্রিয়ায় অচেতন হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী কামরুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকরা বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হতে শুরু করেন সকাল ৯টার দিকে। এ সময় ইয়ার্ডে জরুরি চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মালিকপক্ষ শুরুতে তা স্বীকারও করেনি। ফায়ার সার্ভিসকেও তারা এটা অবহিত করেনি। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে খবর পেয়ে তাদের দল ঘটনাস্থলে যায়।
যা বলছে মালিকপক্ষ
প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও ধরেননি। তবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলী বলেন, ‘জাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি ছিল না। ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক থেকে বের হওয়া পানিতে দুর্গন্ধ পাওয়ার খবরে নিরাপত্তা কর্মকর্তা, ফোরম্যানসহ কয়েকজন গ্যাস শনাক্তকারী যন্ত্র নিয়ে সেখানে যান। তারা ভেতরে ঢোকার পর অন্য শ্রমিকরা সেখানে গেলে সবাই গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান।
আগেও একাধিকবার দুর্ঘটনা ঘটেছে এই ইয়ার্ডে
ফেরদৌস স্টিলে এর আগেও দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন একাধিক শ্রমিক। বিলসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর ওপর থেকে পড়ে মৃত্যু হয় খলিলুর রহমান নামে এক শ্রমিকের। বৈদ্যুতিক কাজ করতে গিয়ে ২০২৩ সালে নিহত হন বাবু নামের আরেক শ্রমিক।
সব কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা
৯ শ্রমিকের মৃত্যুর এ ঘটনায় ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের সব কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মহসিন।
- বিষয় :
- জাহাজ