ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেরপুর

যত্রতত্র বালু তোলায় নদনদীর ভাঙন

যত্রতত্র বালু তোলায় নদনদীর ভাঙন
×

শেরপুরের নকলা উপজেলার চরঅষ্টধার ইউনিয়নের নারায়ণখোলা এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন। গত শুক্রবার তোলা। ছবি: সমকাল

দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর 

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৪৫

শেরপুরের নকলা উপজেলার চরাঞ্চলের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে খরস্রোতা মৃগী ও ব্রহ্মপুত্র নদ। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত নদী দুটি খনন করা হয়নি। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে ভরাট হয়েছে। সেসঙ্গে যত্রতত্র বালু তুলছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এতে গভীর খাদ সৃষ্টি হয়ে বদলে গেছে নদীর গতিপথ। কয়েক বছর ধরে বর্ষাকালে তীর ভেঙে ক্রমেই লোকালয়ের দিকে এগিয়ে আসছে নদী। এরই মধ্যে চরঅষ্টধার ও চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের বহু বসতভিটা বিলীন হয়েছে। চরাঞ্চলে বেড়েছে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা। পাশাপাশি বেড়েছে দারিদ্র্য।

এতদিন নদীতীরের অসচ্ছল ও দরিদ্র মানুষ শুকনো মৌসুম এলে ক্ষয়ক্ষতির কথা ভুলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু নদী এখন এতটাই বেপরোয়া আচরণ করছে যে সারা বছরই তীর ভাঙছে। নদীতে বিলীন হচ্ছে মানুষের স্বপ্ন।

চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে দেখা যায়, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল ও গারো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে মৃগী নদীর উৎপত্তি। নদীটি শেরপুরের ওপর দিয়ে পূর্ব দিকে নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ও চরঅষ্টধার ইউনিয়ন দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই অঞ্চলে নদীটি পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের শাখা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কয়েক বছর ধরে নদীতে তীব্র ভাঙন দেখা যাচ্ছে। পূর্বদিক থেকে গতিপথ পরিবর্তন করে এগিয়ে চলেছে উত্তর দিকে।

চন্দ্রকোনা বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে চকবরইগাজী ঈদগা মাঠে গিয়ে দেখা যায়, সেখান থেকে চিকারবাড়ি ঘাট দিয়ে এগিয়ে চলেছে মৃগী নদী। ভাঙনে বিলীন হয়েছে স্থানীয় আফাজের বাড়ির একাংশ ও চিকারবাড়ি ঘাট। তার পরও ভাঙন থামছে না। দক্ষিণপাড়া ঈদগা মাঠ হয়ে আবার পূর্বদিকে যাচ্ছে নদী। এতে বিলীন হয়েছে প্রায় ১০ একরের বেশি কৃষিজমি।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে। তাঁর ভাষ্য, চলতি বছর প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এতে কৃষিজমি, রাস্তা, ঈদগা মাঠসহ অনেক  স্থাপনা বিলীন হয়েছে। তিনি বলেন, আফাজ উদ্দিনের বাড়ি প্রায় নদীতে বিলীন। রজব আলীর অর্ধেক বাড়ি নদী চলে গেছে। শত বছরের চিকারবাড়ি ঘাটের অস্তিত্ব নেই। সেখানকার বাসিন্দা বাবুল মিয়া, টাকী মিয়ার বসতঘর ও কৃষিজমির হদিস নেই। কেন নদীর এমন ভয়ংকর রূপ? জানতে চাইলে প্রবীণ এই ব্যক্তি বলেন, নদীতে পলি জমেছে। খনন হয়নি বহু বছর। প্রভাবশালীরা বছরের পর বছর বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে গভীর গর্ত করে নদী থেকে বালু তুলে বিক্রি করছে কোটিপতি হচ্ছেন। কিন্তু গভীর খাদ হওয়ায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে রুদ্ররূপ ধারণ করেছে। এখন সারা বছরই ভাঙছে। অথচ প্রশাসন কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের টনক নড়ছে না। নদী তীরের বাসিন্দা সুরুজ্জামান, আনিসুর রহমান, আব্দুর রহিম ও রফিকুল ইসলাম জানান, তাদের প্রায় পাঁচ একর কৃষিজমি নদীতে চলে গেছে। ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বাছুর আলগা দড়িপাড়া গ্রামটি মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।

চিকারঘাট এলাকার ভাঙনের শিকার কৃষক আসাদুল মিয়া বলেন, ‘আমরা নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছি।  থাকার জায়গা নেই, কাজ নেই। নদী তীরের মানুষের আহাজারি কেউ শুনতে পায় না।’

চরমধুয়া গ্রামটিতে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে নদীভাঙন। এখানে ধান, পাট, ভুট্টা ও সরিষা চাষাবাদের সঙ্গে জড়িত অনেক কৃষক। নদীভাঙনে অল্প সময়ে অনেক পরিবার হারিয়েছে বসতভিটা। কেউ কেউ অনেক দূরে গিয়ে বসতঘর তুলে দিনমজুরের কাজ করছেন। আবার কেউ ঢাকায় চলে গেছেন। কয়েকশ পরিবার হারিয়েছে তাদের সবকিছু। নদীভাঙনে চরমধুয়া গ্রামের প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের বেশির ভাগ বিলীন হয়েছে। কৃষিপণ্য ঘোড়ার গাড়িতে করে নিতে হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আব্দুর রশিদ, প্রাক্তন নায়েব আব্দুল বারেক, সাবেক ইউপি সদস্য চানু মিয়ার বসতঘর ও চাষাবাদের জমি নদী চলে গেছে। তারা দাবি করেন, নদীতে দ্রুত বাঁধ না দিলে  চরমধুয়া নামাপাড়া হারিয়ে যাবে।

চরমধুয়া নামাপাড়া গ্রামের তিন হাজারের অধিক মানুষের বসবাস। গ্রামের সায়েদ মিয়া, শফিকুল ইসলামসহ কয়েকজনের ভাষ্য, যেভাবে ভাঙন এগিয়ে যাচ্ছে তাতে কিছু দিনের মধ্যে কবরস্থান, কমিউনিটি ক্লিনিক, গুচ্ছগ্রাম, মসজিদ ও বিদ্যালয় ভাঙনের মুখে পড়তে পারে। তারা বলেন, গ্রামের বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হলে দুর্ভোগের সীমা থাকে না। অনেক সময় হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যায়। 

এদিকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে চরঅষ্টধার ইউনিয়নের নারায়ণখোলা রেহাই অষ্টধার ও  দক্ষিণ নারায়ণখোলা এলাকার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এই অঞ্চলে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন। এরই মধ্যে দক্ষিণ নারায়ণখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীতে বিলীন হয়েছে। রেহাই অষ্টধারের প্রান্তিক কৃষক আহাদ মিয়া জানান, গত কয়েক বছরে  নারায়ণখোলা রেহাই অষ্টধারের প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। তাদের বসতঘর, চাষাবাদের জমি হারিয়ে গেছে নদীতে।

নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহাঙ্গীর আলমের ভাষ্য, মৃগী নদী তীরের ভাঙন কবলিত এলাকা জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে কিছুদিন আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সেখানে ছিলেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শতাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম বলেন, নারায়ণখোলা রেহাই অষ্টধার এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ ৫০০ মিটার এলাকায় অস্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চরমধুয়া এলাকায় ৮৫০ মিটার  এলাকার ভাঙন প্রতিরোধের জন্য ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে  পাস হলে কাজ শুরু হবে। তিনি বলেন, আসলে ভাঙনের যে অবস্থা তাতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না করলে ভাঙন ঠেকানো খুব কঠিন।

শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের  নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ্ত চৌধুরী জানান, চরমধুয়া নামাপাড়া এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে সাড়ে ৮০০ মিটার এলাকা অস্থায়ীভাবে মেরামত করার জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু হবে।

আরও পড়ুন

×