টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সরবরাহ
নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চলমান দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে একজন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার (এটিইও) বিরুদ্ধে। এ ছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন না হলেও মনোনয়নপত্রের নামে পদপ্রতি ৫০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সূত্র বলছে, দুটি ক্লাস্টারে প্রশ্নপত্র বিক্রি করে কমপক্ষে দুই লাখ টাকা এবং কমিটি নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের নামে আরও প্রায় এক লাখ নিয়মবহির্ভূতভাবে নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (টিইও) এমন অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়ে বলেছেন, এটিইওদের আগেই নিয়মবহির্ভূত কিছু না করতে সতর্ক করা হয়েছিল। অভিযুক্ত এটিইও সালমা আক্তার বলেন, টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র সরবরাহের অভিযোগটি সত্য নয়।
নান্দাইল উপজেলার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সরকারি পরিপত্রে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়গুলো নিজেরাই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করে পরীক্ষা নেবে। সম্ভব না হলে কাছাকাছি দুই-তিনটি বিদ্যালয় একত্রে প্রশ্ন তৈরি করেও পরীক্ষা নিতে পারবে। কিন্তু উপজেলার রাজগাতী, মুশুলী, আচারগাঁও ও সিংরইল ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত দুটি ক্লাস্টারের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সবাই একই রকম প্রশ্নে পরীক্ষা নিচ্ছে।
শিক্ষকদের কাছ থেকে জানা গেছে, তারা ওই প্রশ্নপত্র ক্লাস্টার দুটির এটিইও সালমা আক্তারের কাছ থেকে পেয়েছেন। তিনি শিক্ষার্থী অনুপাতে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করেছেন। ফলে পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ফি না নেওয়ার বিধান থাকলেও বিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন কৌশলে ফি আদায় করেছে।
এ ছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে ম্যানেজিং কমিটি গঠনের জন্য নির্বাচন না হলেও চারটি পদের মনোনয়নপত্র বিক্রি বাবদ দুই হাজার টাকা করে ওই এটিইওকে দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয়-২ শাখা কর্তৃক জারি করা এক পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য নির্বাচনের ব্যয় মনোনয়নপত্র বিক্রয় লব্ধ টাকা থেকে নির্বাহ করতে হবে। বিদ্যালয়ের ১২ সদস্য বিশিষ্ট ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই সম্পন্ন হচ্ছে। এরপরও চারটি পদের (দুজন নির্বাচিত পুরুষ অভিভাবক ও দুজন নারী অভিভাবক সদস্য পদ) মনোনয়নপত্র বিক্রি বাবদ প্রতিটির বিপরীতে ৫০০ টাকা করে মোট ২০০০ টাকা সংশ্লিষ্ট এটিইওকে দিতে বিদ্যালয়গুলোকে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিভাবক সমাবেশ ডেকে ফি আদায়
মুশুলী ইউপির মুশুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সালমা বেগম জানান, ক্লাস্টারভিত্তিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রধান শিক্ষককে দিয়ে প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়েছে, সেই প্রশ্নেই পরীক্ষা নিচ্ছেন। তাদের ক্লাস্টারের প্রশ্নের সঙ্গে অন্য ক্লাস্টারের প্রশ্নের মিল থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তারা হয়তো উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে প্রশ্ন কিনে নিয়েছেন।
পরীক্ষা হয়ে গেছে এমন দুটি বিষয়ের প্রশ্ন হাতে নিয়ে দেখা যায় সেসব প্রশ্নপত্রের ওপরে লেখা রয়েছে– দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন, তার নিচে নান্দাইল, ময়মনসিংহ, তারপর রয়েছে বিষয় ও শ্রেণির নাম। তবে কোন বিদ্যালয়ের প্রশ্ন, তা লেখা নেই।
জানা গেছে, প্রশ্নপত্র কেনা বাবদ যে চার হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে সে জন্য মা সমাবেশ ও অভিভাবক সমাবেশ ডাকা হয়েছিল। অভিভাবকরা তাদের ছেলে-মেয়েদের পরীক্ষা ফি দিতে রাজি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তা আদায় করা হয়েছে।
মোরাগালা সরকারি প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক জাকারিয়া জানান, তারা ক্লাস্টারের প্রশ্ন কিনে এনে পরীক্ষা নিচ্ছেন। পরীক্ষার ফি বাবদ শিক্ষার্থীদের থেকে সামান্য কিছু টাকাও নিয়েছেন।
নগরকচুরী বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, ক্লাস্টার প্রশ্নপত্র করলেও তা টাকার বিনিময়ে সরবরাহ করেছেন সংশ্লিষ্ট এটিইও সালমা আক্তার। আর ম্যানেজিং কমিটির মনোনয়নপত্র বাবদ দুই হাজার টাকাও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর অফিসে জমা দিয়েছে।
রাজগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। সহকারী শিক্ষক নিলুফা আক্তার জানান, এটিইও সালমা আক্তারের মাধ্যমে তারা প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। মনোনয়নপত্রের টাকার বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলতে পারবেন বলে জানান তিনি।
রাজগাতী ইউপির চংভাদেড়া বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জিএম কিবরিয়া জানান, স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিন প্রশ্নপত্র ক্রয় বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছেন। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম জানান, ম্যানেজিং কমিটি বাবদ দুই হাজার টাকা তিনি ক্লাস্টার এটিইও সালামা আক্তারের মাধ্যমে অফিসে জমা দিয়েছেন।
কাশিনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, সে ৫০ টাকা পরীক্ষা ফি বিদ্যালয়ে জমা দিয়েছে।
দক্ষিণ কয়রাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, সময়ের অভাবে তারা প্রশ্নপত্র তৈরি করতে না পেরে টাকা দিয়ে তা কিনে এনে পরীক্ষা নিয়েছেন।
এ দুটি ক্লাস্টারের বাইরের বেশ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারাও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রশ্নপত্র কিনে পরীক্ষা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে অনেক বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রের সঙ্গে আগে উল্লিখিত ক্লাস্টারের প্রশ্নের হুবহু মিল রয়েছে। তবে সেগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিক, পৌর সদরে অবস্থিত চণ্ডীপাশা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং চারিআনীপাড়া সরকারি প্রাথমিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারা বিদ্যালয়ের নামে করা ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে একটি চক্র প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে সদর ব্যতীত উপজেলার অন্যান্য বিদ্যালয়ে সরবরাহ করে লাভবান হয়েছে।
রাজগাতী, মুশুলী ইউনিয়ন পরিষদ, সিংরইল ও আচারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় ৭০টি সরকারি প্রাথমিক নিয়ে গঠিত দুটি ক্লাস্টারের দায়িত্বে রয়েছেন এটিইও সালমা আক্তার। ওই সব বিদ্যালয়ে প্রশ্নপত্র বিক্রি করে গড়ে তিন হাজার করে টাকা নিলেও দুই লাখ ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন না হলেও মনোনয়নপত্র বিক্রি বাবদ নেওয়া হয়েছে আরও প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত নান্দাইল উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও) সালমা আক্তার জানান, প্রশ্নপত্র তৈরি বা সরবরাহের দায়িত্ব তাঁর নয়, এটি তৈরি করবে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়। তাই টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র সরবরাহের অভিযোগটি সত্য নয়। বিদ্যালয়গুলোকে আগে আলাদাভাবে প্রশ্ন তৈরি করে পরীক্ষা নিতে এবং পরীক্ষা বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ফি না নিতে বলে দেওয়া হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নামে টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, জামানত হিসাবে সে টাকা রাখা হয়েছে, তা পরে ফেরত দেওয়া হবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (টিইও) ফজিলাতুন নেছা জানান, তাঁর কাছেও এমন অভিযোগ এসেছে। এটিইও কোনো অবস্থাতেই
টাকা নিয়ে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করতে বা মনোনয়নপত্রের নামে টাকা নিতে পারেন না। তিনি (ফজিলাতুন নেছা) আগে এটিইওদের নিয়ে মিটিং করে নিয়ম কানুনের বাইরে কিছু না করতে
সর্তক করে দিয়েছিলেন। তবুও অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
- বিষয় :
- প্রশ্নপত্র ফাঁস