এত পেঁয়াজ যায় কই
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম ও আবদুর রহমান, টেকনাফ
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ১৩:৩৪
পেঁয়াজের দাম রাতারাতি অস্বাভাবিক বাড়াতে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে
ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। গত রোববার বিকেলে ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের খবর
টেলিফোনে সবাইকে জানিয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। এরপর চট্টগ্রামের পাইকারি মোকাম
খাতুনগঞ্জে বিকেল থেকে পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল সোমবার সকাল থেকে
গুদামজাত করা সেই পেঁয়াজ পাইকারি কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ টাকা বাড়তি দামে
বিক্রি করা হয়। খাতুনগঞ্জে ভারতীয় পেঁয়াজের চেয়ে বেশি ছিল মিয়ানমারের
পেঁয়াজ। প্রতিকেজি ৪৩ টাকা দরে কেনা এসব পেঁয়াজ রোববার সকালে বিক্রি হয়েছিল
৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। গতকাল পাইকারি মোকামেই এগুলো বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা।
ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৯০ টাকায়। খুচরা বাজারে এ পেঁয়াজের দাম হয়েছে
১০৫ থেকে ১১০ টাকা। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত এক মাসে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে
তিন হাজার ৫৭৩ টন পেঁয়াজ এসেছে। আবার চট্টগ্রাম বন্দরে ৪১১ টন পেঁয়াজ আছে
তিনটি জাহাজে। রোববার পর্যন্ত ভারত থেকেও এসেছে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ। তারপরও
দাম বাড়তে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে এত পেঁয়াজ যায় কোথায়। টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে
পেঁয়াজ আমদানি হতো সীমিত পর্যায়ে। তবে ভারত পেঁয়াজের দাম ৩০০ ডলার থেকে
বাড়িয়ে টনপ্রতি ৮৫০ ডলার করার ঘোষণা দেওয়ায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে টেকনাফ
দিয়ে আমদানি বাড়ান ব্যবসায়ীরা। গত আগস্টে টেকনাফ দিয়ে ৮৪ দশমিক ১৩২ টন
পেঁয়াজ আমদানি হলেও সেপ্টেম্বরে এসেছে তিন হাজার ৫৭৩ দশমিক ১৪১ টন। ১৫ কোটি
৫৫ লাখ ২৪ হাজার ৩৫৭ টাকায় এসব পেঁয়াজ আমদানি করেন ১০ থেকে ১৫ জন
ব্যবসায়ী। প্রতিকেজি পেঁয়াজ আনতে তাদের গড়ে খরচ হয়েছে মাত্র ৪৩ টাকা।
পরিবহন ও শ্রমিক খরচ পাঁচ টাকা করে ধরলেও পাইকারি মোকামে নিতে এসব পেঁয়াজের
দাম পড়ে ৪৮ টাকা। কেজিপ্রতি পাঁচ টাকা লাভ ধরলেও এসব পেঁয়াজ পাইকারি
মোকামে বিক্রি হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ৫৩ টাকায়। তবে গতকাল চট্টগ্রামের
খাতুনগঞ্জে মিয়ানমারের পেঁয়াজই প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৩ টন পেঁয়াজ বোঝাই একটি ট্রাক টেকনাফ স্থলবন্দর থেকে
খাতুনগঞ্জে আসতে ভাড়া নিচ্ছে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার টাকা। এ হিসাবে প্রতি কেজি
পেঁয়াজ পরিবহনে খরচ হয় ১ টাকা ৩০ পয়সা। ট্রলার থেকে পণ্য ট্রাকে উঠানো এবং
ট্রাক থেকে নামানো বাবদ কেজিতে আরও ১ টাকা লেবার চার্জ যুক্ত করলে খরচ
দাঁড়ায় মোট দুই টাকা ৩০ পয়সা। পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য হওয়ায় প্রতি কেজিতে ১
টাকা ডেমারেজ চার্জ যুক্ত করলেও এ খরচ হয় সর্বোচ্চ তিন টাকা ৩০ পয়সা। এসব
খরচ হিসাবে এনে প্রতি কেজিতে আমদানিকারক ৫ টাকা লাভ করলেও পাইকারি মোকামে
পেঁয়াজ বিক্রি হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ৫৩ টাকা। কারণ খাতুনগঞ্জে যারা পেঁয়াজের
ব্যবসা করছেন তারা কেজিতে ৫০ পয়সা কমিশন নেন। কিন্তু আমদানিকারক পাইকারিতে
৭০ থেকে ৭৫ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করায় তা খুচরা বাজারে গিয়ে বিক্রি হচ্ছে
১০৫ থেকে ১১০ টাকা। হাতবদলে এভাবে দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার পেছনে মিয়ানমার
থেকে পেঁয়াজ আনা ব্যবসায়ীদের দায়ী করছেন খাতুনগঞ্জের কমিশন এজেন্টরা।
খাতুনগঞ্জের হামিদ উল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক
মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া সমকালকে বলেন, পাইকারি এ মোকামে ৫০ পয়সা কমিশনে
পেঁয়াজ বিক্রি করি আমরা। আমদানিকারক যদি বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে আমাদের
কী করার আছে। কেন কম দামে কেনা পেঁয়াজ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, সেটি মনিটর
করার কথা সরকারের। গোয়েন্দা সংস্থা খতিয়ে দেখুক, কারা কারসাজি করছে।
টেলিফোন করে পেঁয়াজ বিক্রি একদিন বন্ধ রেখে গতকাল বাড়তি দামে বিক্রি করার
অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা কাউকে পণ্য বিক্রি বন্ধ করতে ফোন করিনি।
অনেকের কাছে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ নেই। কারণ বাংলাদেশে পেঁয়াজের বড় বাজার
নিয়ন্ত্রণ করে ভারত। এ কারণে আতঙ্ক থেকে হয়তো কেউ কেউ বিক্রি বন্ধ রেখেছিল।
তিনি জানান, গতকাল এমন কোনো পরিবেশ ছিল না খাতুনগঞ্জে। দাম বাড়তি হলেও
বেচাকেনা ছিল। তবে স্বাভাবিকের তুলনায় কম ছিল ক্রেতা।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ
ছগীর আহমদ জানান, ভারতের মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের ফলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
হলে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে দর বেশ বাড়ে। ফলে ভারত সরকার পেঁয়াজের নূ্যনতম
রফতানি মূল্য টনপ্রতি ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করে। আগে যেখানে ২৫০ থেকে ৩০০
ডলারে আমদানি করা যেত, তা ৮৫০ ডলার হওয়ায় ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে পেঁয়াজের
দাম বাড়তে থাকে। রোববার বিকেলে পেঁয়াজ রফতানি একেবারে নিষিদ্ধ করে দেয়
ভারত। এটির সুযোগ নিতে পারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৫ দিনে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে এককভাবে সবচেয়ে
বেশি পেঁয়াজ এনেছেন এমএইচ ট্রেডিংয়ের মালিক মোহাম্মদ হাশেম। টেকনাফের এ
ব্যবসায়ী একাই প্রায় ৮০০ টন পেঁয়াজ এনেছেন বলে সমকালকে জানান তিনি।
সর্বোচ্চ পেঁয়াজ আমদানির কথা জানালেও অতিরিক্ত মুনাফা করার অভিযোগ অস্বীকার
করে মোহাম্মদ হাশেম বলেন, দেশে আনা পেঁয়াজ নূ্যনতম লাভে বিক্রি করেছি
আমরা। পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য হওয়ায় এখানে আমাদের লোকসানও অনেক বেশি। তারপরও
কেন পেঁয়াজের দাম এতটা বেড়েছে, তা খতিয়ে দেখুক সরকার। পাইকারি ও খুচরা
ব্যবসায়ীরাই পেঁয়াজের দাম নিয়ে কারসাজি করছে বলে তার অভিযোগ। টেকনাফ দিয়ে
পেঁয়াজ আমদানি করা অন্য বড় ব্যবসায়ীরা হচ্ছেন মো. জব্বার, মো. সেলিম, মো.
সাদ্দাম ও মো. শওকত আলী। গত ১৫ দিনে আমদানি করা পেঁয়াজের বেশিরভাগই তাদের।
চট্টগ্রামে বন্দরে তিন জাহাজে আছে ৪১১ টন পেঁয়াজ :বন্দরের টারমিনাল
ম্যানেজার কুদরত-ই-খুদা মিল্লাত জানান, চীন, মিসর ও তুরস্ক থেকে ৪১১ টন
পেঁয়াজ নিয়ে বন্দরে এসেছে তিনটি জাহাজ। এসব জাহাজে মোট ১৪টি কনটেইনারে
পেঁয়াজ রয়েছে।
বরিশাল থেকে সুমন চৌধুরী জানান, বরিশালে খুচরা বাজারে পেঁয়াজের কেজি ১০০
টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। গত রোববার রাতে ভারত থেকে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের
খবর প্রচার হওয়ার পর ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রতি কেজিতে কমপক্ষে ৩০ টাকা দাম
বেড়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল নগরীতে পেঁয়াজ ছাড়াই খোলা বাজারে পণ্য
বিক্রি কার্যক্রম উদ্বোধন করেছে বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ
(টিসিবি)। এদিকে গতকাল নগরীতে টিসিবির চিনি, মসুর ডাল ও সয়াবিন তেল বিক্রি
কার্যক্রম উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান। টিসিবি সারাদেশে ৪৫
টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রির ঘোষণা দিলেও বরিশালে পণ্য তালিকায় এর নাম
নেই।
টিসিবির বরিশাল বিভাগীয় প্রধান আনিছুর রহমান জানান, কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকেই তাদের পেঁয়াজ সরবরাহ করা হয়নি।
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটের বাজারে একরাতেই দ্বিগুণ দাম বেড়েছে পেঁয়াজের।
রোববার বাজারে যে পেঁয়াজ ৬০-৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় সে পেঁয়াজ গতকাল
১১০-১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গতকাল নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে বিষয়টি
নিশ্চিত হওয়া গেছে। আখালিয়া বিজিবি হেড কোয়ার্টার গেটের বাসিন্দা ট্রাভেলস
ব্যবসায়ী মকবুল হোসেন তালুকদার বলেন, হঠাৎ দাম বাড়ায় পেঁয়াজ কিনিনি।
হিলি (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, হিলি স্থলবন্দরের পাইকারি বাজারে মাত্র
কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকা। যা গত
শনিবার ও রোববার দুপুর পর্যন্ত ছিল ৪৭-৫০ টাকার মধ্যে। গতকাল দুপুর ২টায় এ
সংবাদ লেখা পর্যন্ত এ বন্দর দিয়ে ভারত থেকে শুধু পাথর আমদানি হয়েছে।
পেঁয়াজের কোনো চালান দেশে আসেনি।
বন্দরের আমদানিকারক মোবারক হোসেন জানান, বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায়
৪০-৫০টি পেঁয়াজ বোঝাই ট্রাক সীমান্তের ওপারে আটকে আছে। অনেকের নতুন এলসি
করা আছে, সেগুলো আগামী ২ অক্টোবরের মধ্যে ঢোকার কথা।
- বিষয় :
- এত পেঁয়াজ যায় কই
