মহিলা পরিষদের ছায়া সংসদ বিতর্ক
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নারী আন্দোলনের হাতিয়ার, একমাত্র মাপকাঠি নয়
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:৩২
নারীর অধিকার ও আন্দোলনের কথা তুলে ধরা, নির্যাতন-সহিংসতার ঘটনা দ্রুত মানুষের নজরে আনা এবং জনমত গঠনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ‘ছায়া সংসদ বিতর্কে’ সরকারি দলের বক্তারা। তাদের মতে, অনলাইন প্রচারণা নারী আন্দোলনের পরিসর স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত করেছে। তবে বিরোধী দলের বক্তারা বলেছেন, অনলাইনের দৃশ্যমানতা দিয়ে কোনো আন্দোলনের প্রকৃত প্রভাব বা গ্রহণযোগ্যতা সব সময় নির্ধারণ করা যায় না।
মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক মাস ২০২৬-এর কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘ছায়া সংসদ বিতর্কে’ এসব বিষয় উঠে আসে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বিতর্কের বিষয় ছিল ‘অনলাইন দৃশ্যমানতা আজ নারী আন্দোলনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তরুণ সংগঠক ও কর্মকর্তারা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। বিতর্কে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন সংগঠনের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। সূচনা করেন প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার উপপরিষদের সিনিয়র প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান।
সরকারি দলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শেখ নাহিদ হাসান।
সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহামুদ খালিদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের দশম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ঐতিহ্য রেজা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী উমে সুহালা এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রাকিবুল ইসলাম। সরকার দলের পক্ষে যুক্তি খণ্ডন করেন মাহামুদ খালিদ।
বিরোধী দলের দলনেতা ছিলেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রিসার্চের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তাহসিনা সুলতানা রিদনী। উপনেতা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী প্রজ্ঞা লাবণী সাদিয়া। সংসদ সদস্য হিসেবে ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের দশম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী নাদিমা আফরোজ মণ্ডল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মো. মুজাহিদ ইসলাম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সেফাত ফয়সাল। বিরোধী দলের পক্ষে যুক্তি খণ্ডন করেন তাহসিনা সুলতানা রিদনী।
বিতর্কে সরকারি দলের বক্তারা বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নারীদের নিজেদের কথা, অভিজ্ঞতা ও অধিকার-দাবি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে। সামাজিক মাধ্যমে নারী নির্যাতন, সহিংসতা, বৈষম্য ও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দ্রুত মানুষের নজরে আনা এবং জনমত গঠন সম্ভব হচ্ছে। অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে নারী আন্দোলনের পরিসর স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত হয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা, বিভিন্ন সংগঠন ও কর্মীর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং দ্রুত সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রেও অনলাইন মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে তারা মত দেন।
অন্যদিকে বিরোধী দলের বক্তারা অনলাইন দৃশ্যমানতার নেতিবাচক দিক তুলে ধরে বলেন, সামাজিক মাধ্যমে কোনো বিষয় কতজন দেখেছে, কত লাইক বা কমেন্ট হয়েছে, কতজন অনুসরণ করছে কিংবা কত মানুষের কাছে কোনো পোস্ট পৌঁছেছে– এসব সূচক দিয়ে সব সময় একটি আন্দোলনের প্রকৃত প্রভাব বা গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করা যায় না। অ্যালগরিদম, কৃত্রিমভাবে বাড়ানো রিচ কিংবা পরিকল্পিত প্রচারণার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নারীরা অনলাইনে সাইবার হয়রানি, ট্রলিং, হুমকি, অপমান ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের শিকার হচ্ছেন, যা নারী কণ্ঠকে আরও সংকুচিত করতে পারে। তাই অনলাইন দৃশ্যমানতার পাশাপাশি আন্দোলনের বাস্তব সামাজিক প্রভাব ও মাঠ পর্যায়ের অংশগ্রহণকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তারা।
স্পিকার ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারী আন্দোলন নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা পালন করে। সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইকে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। নারী সমাজ কোনো অভিন্ন সত্তা নয় উল্লেখ করে তিনি বিভিন্ন স্তরের নারীদের পারস্পরিক সংযোগ বা ‘ইন্টারসেকশনাল সলিডারিটি’র গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জনমত গঠন এবং সঠিক ডিজিটাল দক্ষতার ব্যবহার নারী আন্দোলনের পথকে আরও প্রশস্ত করতে পারে। ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক গণআন্দোলনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতাও অপরিহার্য।
বিতর্ক শেষে অংশগ্রহণকারীদের ক্রেস্ট, সার্টিফিকেট ও ফুল দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ প্রায় ১৫০ জন উপস্থিত ছিলেন। সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সংগঠন উপপরিষদের সদস্য আফরা আনতারা।
- বিষয় :
- বিতর্ক