সরকার-বিরোধী দল সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায় বেইজিং
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ০০:৩৩
বাংলাদেশের সরকার, বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায় চীন। কোন দল সরকারে আছে, নাকি বাইরে; সেটিকে বন্ধুত্বের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করে না বেইজিং। রাজনৈতিক যোগাযোগ, উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়িয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী দেশটি।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং বুধবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কোন রাজনৈতিক দল সরকারে আছে, নাকি বাইরে এর ভিত্তিতে চীন বন্ধুত্ব নির্ধারণ করে না। আদর্শিক বিভাজনও তৈরি করতে চায় না দেশটি।
লিউ হাইশিং বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ভিত্তি ঐতিহাসিক আস্থা, একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়। গত পাঁচ দশকে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সহযোগিতায় নির্মিত মহাসড়ক, সেতু ও টানেলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব প্রকল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রেখেছে।
ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে মোংলা বন্দর শিল্পপার্ক এবং তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন লিউ। বাংলাদেশ থেকে উন্নতমানের পণ্য আমদানি বাড়াতেও চীন আগ্রহী বলে জানান তিনি।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাম্প্রতিক পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের প্রসঙ্গ তুলে লিউ বলেন, দল পরিচালনা, শৃঙ্খলা ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিনিময়ে প্রস্তুত চীন। সরকারে-সরকারে সম্পর্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, তরুণ নেতৃত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে চায় বেইজিং। এ ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মকে দুই দেশের বন্ধুত্ব এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে দেশটি।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-চীন সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজের উদ্বোধন করা হয়। কেন্দ্রটি দুই দেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে কাজ করবে বলে জানান লিউ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে পরিচালিত। বাংলাদেশ স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রিজভী বলেন, উৎপাদন, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, বস্ত্র, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ওষুধশিল্পে চীনা বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে। চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোরও আহ্বান জানান তিনি।
প্রায় ৩০টি চীনা কোম্পানির ৫০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগে প্রস্তাবিত চীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে প্রায় এক লাখ কর্মসংস্থান হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় অনুষ্ঠানে। এ ছাড়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং দেশে একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় চীনের সহযোগিতা চান তিনি। এক চীন নীতির প্রতি বিএনপির সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেন রিজভী।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশে সবাই এক সুরে কথা বলে। চীনকে বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, সহযোগিতা ও উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, নতুন উদ্বোধন করা কেন্দ্রটিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে চীনের মতবিনিময়ের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। তরুণ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সফর, যৌথ অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাড়ানোরও প্রস্তাব দেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গার কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চল সংকটে রয়েছে। তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা জরুরি।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক বিমানবাহিনীপ্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন।