বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী
চিকিৎসায় থাকলেও প্রণোদনায় নেই
ফাইল ছবি
রাজবংশী রায়
প্রকাশ: ১০ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১০ মে ২০২০ | ১৪:৪১
বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের মহামারি চলছে। দেশে প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ পরিস্থিতিতে সরকারের হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্ত করে চিকিৎসার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। করোনা সংক্রমণের পর পরই কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালকে এর চিকিৎসায় যুক্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল রোববার থেকে করোনা চিকিৎসায় যুক্ত করা হয়েছে রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আনুষ্ঠানিকভাবে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন। তবে করোনা চিকিৎসায় যুক্ত করা হলেও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সরকার ঘোষিত সুযোগ-সুবিধায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যদিও এ পর্যন্ত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের মোট আক্রান্তদের মধ্যে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। এ অবস্থায় তাদের সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার জোরালো দাবি উঠেছে। সরকার ঘোষিত আর্থিক সহায়তায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত না করাকে দুঃখজনক বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা। তাদের অভিমত, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও করোনা আক্রান্ত মানুষের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। নতুন করে বেসরকারি খাতকে করোনা চিকিৎসায় যুক্ত করা হলে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি আরও বাড়বে। কিন্তু তারা সরকারি কর্মচারীদের মতো সুবিধা প্রাপ্য হবেন না। এতে তারা কাজের উৎসাহ হারাবেন। সার্বিকভাবে করোনা চিকিৎসাও বাধাগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে বারডেম হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাফর আহমেদ লতিফ সমকালকে বলেন, সরকার যদি কোনো বেসরকারি হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করে, তাহলে সেই হাসপাতালে যারা চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, তাদেরও সরকারি সুবিধাভোগীর আওতায় আনা উচিত। তা না হলে সরকারের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, করোনা চিকিৎসা এবং প্রতিরোধে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর পাশাপাশি প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য যেসব কর্মচারী যুক্ত থাকবেন, তাদের উৎসাহ দিতে প্রধানমন্ত্রী একটি প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন। তখন বেসরকারি খাতের বিষয়টি আলোচনায় আসেনি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় করোনা চিকিৎসায় বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হচ্ছে। সরকারি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো তাদের সুযোগ-সুবিধা নেই এটি সত্য। কীভাবে তাদের যুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। তিনি যে পরামর্শ দেবেন, সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) গত ২৫ এপ্রিল স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি পাঠিয়ে সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী এবং ইন্টার্ন চিকিৎসক, অনারারি চিকিৎসক, রেসিডেন্স, নন রেসিডেন্স ও ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়নরত সব চিকিৎসকের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে। বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় নিয়োজিত সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। ওই ঘোষণার পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আক্রান্ত ও মৃতের ক্ষতিপূরণের জন্য কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে আদেশ জারি করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে সরকারি হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক, অনারারি চিকিৎসক, রেসিডেন্স, নন রেসিডেন্স ও ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়নরত চিকিৎসকদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে করোনার চিকিৎসা দেওয়া বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
সরকারি প্রণোদনায় বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতাল শুরু থেকেই করোনা চিকিৎসায় যুক্ত আছেন। বেসরকারি আরও হাসপাতালকে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এই চিকিৎসা দিতে গিয়ে বেসরকারি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের চিকিৎসা ব্যয় প্রতিষ্ঠান থেকে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে বহন করা হচ্ছে। সরকারি প্রণোদনায়ও তাদের বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। এতে তারা করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় উৎসাহ হারাবেন। সুতরাং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের জন্যও প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।
আক্রান্তদের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের : বিএমএ সূত্র জানায়, গতকাল পর্যন্ত সারাদেশে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী মিলে ১ হাজার ৪১৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসক ৫৪৮, নার্স ৩৫৪ এবং স্বাস্থ্যকর্মী ৫১১ জন। আক্রান্তের এই তালিকায় বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও আছেন। বেসরকারি হাসপাতালের কতজন আক্রান্ত হয়েছেন- এমন প্রশ্নে বিএমএর দপ্তর সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শেখ শহীদ উল্লাহ সমকালকে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি পৃথক করে হিসাব করা হয়নি। তবে কোন প্রতিষ্ঠানে কতজন আক্রান্ত হয়েছেন, সেটির তালিকা করা হয়েছে। সেটি পর্যালোচনা না করে সুনির্দিষ্ট হিসাব করা কঠিন। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী মিলে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। তবে রাজধানীর কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৫৫ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৮ জন, পুরান ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে ২১ জন, অ্যাপোলো (বর্তমানে এভারকেয়ার) হাসপাতালে ৭ জন, ইমপালস হাসপাতালে ২০ জন, আল বারাকা কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ১০ জনসহ বেসরকারি হাসপাতালের চারশ'র ওপরে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন।
এ বিষয়ে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, তাদের হাসপাতালটি করোনা ডেডিকেটেড না হলেও চিকিৎসার জন্য আক্রান্ত অনেকেই চলে আসেন। এ ধরনের রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালের ৫০ জন নার্স এবং ৫ জন চিকিৎসক করোনা পজিটিভ হয়েছেন। হাসপাতালই তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রণোদনায় যুক্ত হলে সেটি একটি মহৎ উদ্যোগ হবে। এতে চিকিৎসাসেবায় কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে বলেও মনে করেন তিনি।
সরকারি সহায়তা যারা প্রাপ্য হবেন : করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় যেসব চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যক্ষভাবে কাজ করবেন, তাদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর বাইরে সাধারণ মানুষের সেবায় মাঠে থেকে দায়িত্ব পালনকারী প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবং প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারীর জন্য বিশেষ বীমার ব্যবস্থা করার ঘোষণাও দেন তিনি। এর পর অর্থ মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করে। সেখানে বলা হয়, সরকারি কর্মচারীদের গ্রেড এবং আক্রান্ত ও মৃত্যু অনুযায়ী আর্থিক সহায়তার পরিমাণ হবে ৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০তম গ্রেডের কেউ আক্রান্ত হলে পাবেন ৫ লাখ টাকা। ১০ম থেকে ১৪তম গ্রেডের কেউ আক্রান্ত্ম হলে পাবেন সাড়ে ৭ লাখ আর ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কেউ আক্রান্ত হলে পাবেন ১০ লাখ টাকা। একইভাবে ১৫ থেকে ২০তম গ্রেডের কেউ মারা গেলে ২৫ লাখ টাকা, ১০ম থেকে ১৪তম গ্রেডের কেউ মারা গেলে সাড়ে ৩৭ লাখ ও ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কেউ মারা গেলে ৫০ লাখ টাকা পাবেন। বেসরকারি হাসপাতালে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া কোনো চিকিৎসক, নার্স বা কর্মী আক্রান্ত হলে বা মারা গেলেও সরকারি এ আর্থিক সুবিধা পাবেন না।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফোকাল পারসন ও অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান খান সমকালকে বলেন, বেসরকারি কর্মচারীদের প্রণোদনার বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আগের পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী প্রণোদনা ঘোষণা করেছিলেন। এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। সরকার বর্তমান পেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সেটি সেভাবে বাস্তবায়ন হবে। তার আগে এ বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।
বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, করোনা চিকিৎসায় যুক্ত বেসরকারি হাসপাতালের কর্মীরা সরকারি সুবিধার আওতায় না এলে সেটি হবে সবচেয়ে দুঃখজনক। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও তো দেশের মানুষের সেবা দেওয়া হচ্ছে। এই সেবা দিতে গিয়ে কেউ আক্রান্ত হলে কিংবা মৃত্যুবরণ করলে তার প্রতি সরকার বা রাষ্ট্রের কোনো দায়বদ্ধতা থাকবে না- এটি হতে পারে না। সরকারের সিদ্ধান্ত বিবেচনাপ্রসূত হয়নি। বেসরকারি খাতের কর্মীদেরও সরকারি সুবিধার আওতায় আনতে হবে। করোনা প্রতিরোধ সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটিও এ বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুলল্গা সমকালকে বলেন, কমিটি যে ২২টি সুপারিশ করেছে তার মধ্যে করোনা চিকিৎসায় যুক্ত বেসরকারি খাতের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিষয়টি উল্লেখ করা আছে। সুযোগ-সুবিধার আওতায় না এনে তাদের কাছে সেবা প্রত্যাশা করার ধারণাটি সঠিক নয়। তাদেরও সমপর্যায়ের সুবিধা দিতে হবে।