ফল
আবার থোকায় থোকায় ঝুলুক গোলাপ জাম
গোলাপ জাম। চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানার পাবলিক মোড়ের ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুলসংলগ্ন এলাকা থেকে তোলা। ছবি- লেখক
মো. শাহ আলম মিয়া
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ | ১১:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
নব্বইয়ের দশকেও যাদের শৈশব কেটেছে পাড়াগাঁয়ে, তাদের কাছে গোলাপ জাম শুধু একটি ফল নয়, বরং এক টুকরো অমলিন স্মৃতি। তখন স্কুল ছুটির পর দল বেঁধে গাছ থেকে তাজা তাজা ফল পেড়ে খাওয়ার চল ছিল। এ তালিকার শীর্ষে থাকত গোলাপ জাম। পাকা গোলাপ জাম হাতে নিয়ে এর ভেতরের বীজের খটখট শব্দ শোনা ছিল শৈশবের রোমাঞ্চকর ঘটনা। আর কামড় বসালেই কী মিষ্টি গন্ধ যে ছড়িয়ে পড়ত! পুষ্টিকর ও সুস্বাদু গোলাপ জামের গাছ একসময় গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে প্রচুর দেখা যেত। গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকত গোলাপ জাম। অথচ ফলটি এখন বিলুপ্তির পথে।
গোলাপ জামের বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium jambos. অন্যান্য নাম Rose Apple, Malabar Plum, Gulab Jamun. অনেক অঞ্চলে এটি মেওয়া ফল হিসেবেও পরিচিত। এটি Myrtaceae গোত্রের বৃক্ষ। এটি মূলত বাংলাদেশ, ভারত, ফিলিপাইন, চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় জন্মায়। একসময় রাজা বাদশাহদের হেরেমখানা বা অন্দরমহলের প্রিয় ফল ছিল গোলাপ জাম।
এ গাছের কাণ্ড মসৃণ ও ধূসর বর্ণের। সাধারণত মাঝারি আকৃতির হয়। চিরসবুজ বৃক্ষ। এই গাছ গড়ে ৫০ থেকে ৬০ বছর বাঁচে। গাছ লাগানোর দুই-তিন বছর পর থেকে ফল সংগ্রহ করা যায়।
পাতা গাঢ় সবুজ। অনেকটা জাম পাতার মতো। পাতা একক। জোড়ায় জোড়ায় বিপরীত দিকে বিন্যস্ত। পুষ্পবিন্যাস নিয়ত, ফুল উভলিঙ্গিক, অধোগর্ভ ও পুষ্পদণ্ড লম্বা। ফুল অনেকটা জামরুল ফুলের মতো শ্বেত বর্ণের।
গোলাপ জাম দৃষ্টিনন্দন ও সুমিষ্ট। এটি ছোট পেয়ারা বা বেরি বা বরই আকৃতির গোলাকার ফল। ফলের ত্বক অত্যন্ত মসৃণ। কাঁচা অবস্থায় ফল সবুজাভ এবং কিছুটা শক্ত। তবে পাকলে ফল নরম ও সাদাটে বা ফিকে হলুদ বা ঘিয়ে রং বা গোলাপি আভাযুক্ত হয়। ফলের ভেতরে দুটি, ক্ষেত্রবিশেষ একটি বীজ থাকে, যা থেকে চারা গজায়।
ফল পাকলে গোলাপের মতো খুশবু বের হয়। অনেকটা পারস্যের বসরাই গোলাপের মতো। খাওয়ার সময় গোলাপজলের মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়। পৃথিবীতে এটিই একমাত্র ফল, যেটিতে গোলাপের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। সাধারণত মাঘ-ফাল্গুন মাসে গাছে ফুল আসে এবং বৈশাখ-শ্রাবণ মাসের মধ্যে ফল পাকে। ফল পাকার আগে থেকেই পাখি-বাদুড়সহ নানা প্রাণী এই ফল খাওয়া শুরু করে, তাই এই গাছটি ওয়াইল্ড সাপোর্টিভ প্লান্ট হিসেবে পরিচিত।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গোলাপ জাম কাঁচা বা রান্না করে খাওয়া হয়। কাঁচা অবস্থায় প্রতি ১০০ গ্রামে পুষ্টিমান ১০৫ কিলো ক্যালরি। এটি মূলত ভিটামিন সি, বি ১, বি ২, ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম ও অ্যান্টি অক্সিডেন্টে ভরপুর। এর ছাল, পাতা, ফল ও বীজ ঔষধি গুণসম্পন্ন। এটি ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, বমিভাব দূর করে ও ডায়াবেটিসের উপকার করে। এটি গরমে শরীর ঠান্ডা করে।
বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের কাছে গোলাপ জাম হয়তো তেমন পরিচিত নয়। বাংলার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যের স্বাদ পৌঁছে দিতে গোলাপ জাম গাছ রক্ষা করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণের আওতায় গোলাপ জাম থাকলে খুব ভালো হয়। তাহলে বৃক্ষটি আবার ছড়িয়ে পড়বে গ্রাম-গঞ্জে। আবার গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলবে গোলাপ জাম।
লেখক : উপপরিচালক, বিসিএস প্রশাসন একাডেমি
