আবার নীতি শিথিলতা ব্যাংক খাতে, অপব্যবহারের শঙ্কা
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ | ১০:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কৃত্রিমভাবে আর্থিক চিত্র ভালো দেখানোর কৌশল থেকে বেরিয়ে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে আনা হয়। ফলে খেলাপি ঋণ এক লাফে অনেক বেড়ে যায়। ঋণ আদায়ে কঠোরতার পথ বেছে নেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন নীতি শিথিলতার পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এর উদ্দেশ্য হিসেবে খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করার কথা বলা হচ্ছে।
তবে এ ধরনের শিথিল নীতির অপব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞ ও খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, আগে এ ধরনের শিথিলতার কারণে ব্যাংক খাতের অবস্থা দুর্বল হয়েছে।
ব্যাংকাররা জানান, করোনার সময় এক লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন হয়। ওই সময়ে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নানা উপায়ে কম সুদের ঋণ নিয়ে ফেরত দেননি। সম্প্রতি একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের দাবির মুখে কৌশলে ব্যাংক খাতের একক গ্রাহকের ঋণসীমা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। বন্ধ কলকারখানা চালুসহ অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে নতুন করে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কম সুদের ঋণ পেতে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানোর অনেক ঘটনা রয়েছে অতীতে। এ কারণে এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ ব্যাংকাররা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ের দুজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা সরকারের অন্যতম কাজ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ভারসাম্য রক্ষা করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবির কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিজ্ঞতা ভালো নয়।
কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী লীগের প্রথম মেয়াদে ব্যাংক খাতের নিয়মকানুন আন্তর্জাতিক মানের ছিল। ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের খুশি করতে বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতপশিল শুরু হয়। সেখান থেকে আর কঠোরতায় ফিরতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৮ সালে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হোটেলে বসে বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) কমানোর সিদ্ধান্ত
এবং সুদহার নয়-ছয় নির্ধারণ করা হয়।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, বন্ধ কারখানা সচল করতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার উদ্দেশ্য হয়তো ভালো। তবে কতটুকু স্বচ্ছতার সঙ্গে এই ঋণ দেওয়া যাবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। শুধু ঋণ দিলেই হবে না; গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, বাজার চাহিদার বিষয় দেখতে হবে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর উচ্চ খেলাপি ঋণের মূলে রয়েছে বড় গ্রহীতারা। এখন এলএনজি আমদানিসহ কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা দিতে ঋণসীমা হয়তো বাড়ানো হয়েছে। তার মানে এই নয়, ব্যাংকগুলো বড় ঋণ বাড়িয়ে ফেলবে। বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃতপশিলের মেয়াদ বারবার বাড়লেও ইচ্ছাকৃত খেলাপিকে সুবিধা দেওয়া ঠিক হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে উচ্চ ঝুঁকির দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়ে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায় ঠেকেছে, যা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত বছর প্রথমবারের মতো ব্যাংক খাতের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায়। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মূলধন ঘাটতি ঋণাত্মক, ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমেছে। অনেক ব্যাংক আমানত ফেরত দিতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই বলছেন, দুর্বল ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধার করা অর্থনীতির জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর অবস্থানেই রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের বন্ধ কারখানা চালুর সুযোগ দিতে বিভিন্ন নীতি-সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আগের মতো কেউ যেন অনিয়ম-জালিয়াতি করতে না পারে, সে জন্য তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।
১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ
খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক বাড়তে থাকায় নামমাত্র ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। আগের সব রেকর্ড ভেঙে গত বছর এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল হয়েছে। পুনঃতপশিলের মেয়াদ গত বছর শেষ হয়ে যায়। তবে গত ৭ মে অপর এক নির্দেশনার মাধ্যমে বিশেষ পুনঃতপশিলের মেয়াদ আরেক দফা বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে আগামী জুন পর্যন্ত দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য পুনঃতপশিল করা যাবে। এর মধ্যে ১ শতাংশ দিতে হবে পুনঃতপশিলের সময়। বাকি অর্থ ছয় মাস পর দিলে চলবে।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের ঋণ আদায় বিভাগের প্রধান সমকালকে বলেন, মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ পুনঃতপশিল সুবিধার কারণে ঋণ আটকে যাচ্ছে। কারণ, এ সময়ের জন্য অন্তত এক টাকাও পরিশোধ করতে হচ্ছে না। এতে অর্থপ্রবাহ কমে অর্থনৈতিক গতি ধীর হচ্ছে।
একক গ্রাহকের ঋণসীমায় বড় ছাড়
একটি ব্যাংক একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ কত শতাংশ ঋণ দিতে পারবে, ব্যাংক কোম্পানি আইনে তা সুনির্দিষ্ট করা আছে। সম্প্রতি এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে। ঋণসীমা হিসাবের ক্ষেত্রে এলসি বা গ্যারান্টিসহ বিভিন্ন নন-ফান্ডেড ১০০ টাকা দায়ের রূপান্তর হার ধরা হতো ৫০ টাকা। এখন ধরা হবে ২৫ টাকা। এভাবে একটি ব্যাংক তার মূলধনের ২৫ শতাংশের পুরোটাই ফান্ডেড তথা সরাসরি ঋণ দিতে পারবে। এতদিন যা সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, একজন আমদানিকারকের সুপারিশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই শিথিলতা দিয়েছে। ব্যাংক খাতের বর্তমান দুরবস্থার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রথমে এর বিপক্ষে মত দেন। এরপর এ সিদ্ধান্ত জারির আগে আর্থিক সূচকে ভালো অবস্থানে থাকা কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে একক গ্রাহকের ঋণসীমা না বাড়ানোর পক্ষে সব ব্যাংক মত দেয়। তবে গত ১৪ মে ঋণসীমায় ছাড় দিয়ে সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
দণ্ড সুদ কমিয়ে এক-তৃতীয়াংশ
ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ঋণের সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহারের সীমা নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর আমানতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ দেওয়া যাবে বলে মৌখিকভাবে বলে দেওয়া হয়। পরে যা সুদহারে ‘নয়-ছয়’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ২০২৪ সালের মে মাসে ঋণের সুদহার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করা হয়। এ-সংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়, কোনো ঋণ বা কিস্তি সম্পূর্ণ বা আংশিক মেয়াদোত্তীর্ণ হলে যে সময়ের জন্য মেয়াদোত্তীর্ণ হবে; ওই সময়ের জন্য চলমান বা তলবি ঋণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ঋণস্থিতির ওপর এবং মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির ওপর সর্বোচ্চ দেড় শতাংশ দণ্ড সুদ আরোপ করতে পারবে ব্যাংক। ঋণ পরিশোধের ওপর চাপ তৈরির জন্য এই দণ্ড সুদের বিধান করা হয়েছিল।
ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ মে এক নির্দেশনার মাধ্যমে এই নিয়মে শিথিলতা আনা হয়েছে। এখন দণ্ড সুদ তিন ভাগের এক ভাগ কমিয়ে মাত্র দশমিক ৫০ শতাংশে নামানো হয়েছে।
প্রণোদনা প্যাকেজ
গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমাসহ বিভিন্ন কারণে এখন ঋণ চাহিদা তলানিতে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমেছে। এ অবস্থায় বন্ধ কারখানা সচল, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও চলতি মূলধন ঋণ সুবিধা দিতে নতুন করে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২৩ মে ঘোষিত নতুন তহবিল থেকে ব্যবসায়ীরা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। করোনার সময়কার মতোই এ ক্ষেত্রে সরকারের সুদ ভর্তুকির আওতায় গ্রাহক পর্যায়ে কম সুদের এ ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমকালকে বলেন, করোনার সময়ে ব্যাংকগুলোকে চাপ দিয়ে তহবিল বিতরণে বাধ্য করা হয়। তখন বারবার বৈঠক করে এক ধরনের চাপ তৈরি করা হতো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই চাপাচাপির সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা কম সুদের ঋণ নিয়ে অপব্যবহার করেছেন। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে করোনা-পরবর্তী সময়ে। যে কারণে তখন ৮৪ টাকার ডলার এক লাফে ১২০ টাকায় ঠেকেছিল। ২০২১ সালের আগস্টের ৪৮ বিলিয়নের ওপরে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়নে নেমেছিল।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, প্রণোদনা সরকার বিভিন্ন কারণে দিতে পারে। তবে বন্ধ কারখানা সচলের জন্য প্রণোদনা কাজ করবে কিনা, তা দেখার বিষয়। কেননা যে কারখানা বন্ধ হয়েছে, তার বাজার আছে কিনা, তাও বিবেচ্য। আবার কারখানা হয়তো ভেতরের অদক্ষতা বা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি কিংবা গ্যাস-বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে বন্ধ হয়েছে। ফলে ঋণ দিলেই ঘুরে দাঁড়ানোর নিশ্চয়তা নেই।
ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়; বিশ্বের কোনো দেশেই শুধু প্রণোদনা শিল্প খাতকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেনি। কেননা, শিল্পের জন্য প্রণোদনার চেয়ে বেশি দরকার পুনর্গঠন, নীতি-পদ্ধতি, অবকাঠামো ইত্যাদি। করোনার সময় ইউরোপ ও আমেরিকায় ভোক্তা পর্যায়ে প্রণোদনা দেওয়া হয়। তারা জানত, প্রণোদনার ফলে একটা মূল্যস্ফীতি তৈরি হবে। পরবর্তী সময়ে সুদহার অনেক বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে তারা।
এম এ রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। যে কারণে সরকার হয়তো এখন অস্থায়ী ভিত্তিতে কিছু নীতি গ্রহণ করছে। সরকারের হয়তো এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ কোনো কৌশল থাকতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে দেখা যায়নি। সমস্যা সমাধান করতে হলে সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে।
