অনুপ্রবেশ
বাংলাদেশি কাজল ও ভারতীয় তরুণের প্রেমের গল্প পাল্টে দিল একটি ফোনকল
তরুণ প্যাটেল ও কাজল। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে
বিবিসি বাংলা
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ২০:১০ | আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ | ২০:১৫
বলা হয়, প্রেম কোনো সীমানা মানে না; কিন্তু ভারতের গুজরাটের তরুণ প্যাটেল ও বাংলাদেশি কাজলের জীবনে সীমান্তই এখন প্রধান শত্রু।
প্রথমে প্রেম ও পরে সীমান্ত পেরিয়ে বিয়ে- যার জেরে পরিবারটি আইনি জটিলতায় পড়েছে। গুজরাট পুলিশের ‘অপারেশন ডেল্টা হান্ট’ হঠাৎ সবকিছু ওলটপালট করে দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের জীবনে কোনো অশান্তি ছিল না। হঠাৎ করেই প্রশাসন জানতে পারে যে ওই বাংলাদেশি নারী অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন; ফলে এখন তাঁকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চাইছে প্রশাসন।
তরুণের এখন একমাত্র লক্ষ্য হলো- তাঁর সন্তানরা যেন মায়ের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত করা।
একটি ফোনকল ও গ্রেপ্তার
তরুণ প্যাটেলের বাড়ি গুজরাটের আনন্দ জেলার লাম্বভেল গ্রামে। একটি সাধারণ ফোনকলের সূত্র ধরে ২ জুন তাঁর বাড়িতে যায় পুলিশ।
তরুণ বলেন, ‘কাজলের মা বাংলাদেশে থাকেন। মায়ের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে তিনি মাকে ফোন করেছিলেন। সেই ফোন কলটি ট্র্যাক করা হয় এবং এরপরই পুলিশ আমার বাড়িতে এসে হাজির হয়।’
তরুণ জানান, পুলিশ তাঁর ফোনটি পরীক্ষা করে কাজলের মায়ের নামে সেভ করা একটি নম্বর দেখতে পায় এবং জানতে চায় নম্বরটি কার। তখন তরুণ স্বীকার করেন, তাঁর স্ত্রী বাংলাদেশি এবং ওই ফোনকলটি বাংলাদেশে করা হয়েছিল।
এরপর কাজলকে জিজ্ঞাসাবাদ ও আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ জানায়, কাজলের কাছে কোনো বৈধ নথি, যেমন পাসপোর্ট বা বিয়ের প্রমাণ নেই। তাই তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সঙ্গে কি কাজলের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে তরুণ প্যাটেল বলেন, ‘কাজল মাঝেমধ্যে তাঁর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। যে ফোন কলটি ট্র্যাক করা হয়েছিল, সেদিন ফোনে কাজল তাঁর মায়ের খোঁজ নিচ্ছিলেন। তাঁর মায়ের অস্ত্রোপচার হয়েছিল।’
‘সে কান্নাকাটি করে আমাকে বলেছিল যে তাঁকে মায়ের সঙ্গে কথা বলাতেই হবে। তাই আমি আমার মোবাইলফোন থেকে একটি আইএসডি কল করেছিলাম। আমার স্ত্রী শুধু তাঁর মায়ের কাছে জানতে চায় তিনি কেমন আছেন। গুরুতর কিছু হয়নি তো? ব্যস, এটুকুই। ওই একটি কলই ট্র্যাক করা হয়েছিল। সে কোনো ভুল জায়গায় ফোন করেনি।’ বলেন তরুণ প্যাটেল।
আনন্দ জেলার পুলিশ সুপার জিজি জাসানি বলেন, কাজল যে গুজরাটে অবৈধভাবে বাস করছেন তা প্রমাণিত। বাংলাদেশ থেকে গুজরাটে আসার সময় তাঁর কাছে পাসপোর্ট বা বিয়ের কোনো প্রমাণ ছিল না।
ফেসবুকে বন্ধুত্ব থেকে প্রেম ও বিয়ে
২০১২ সালে বাংলাদেশের গোপালপুর নামে একটি গ্রামের কাজুলির সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয় তরুণের। তাদের বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হয় এবং তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।
তরুণ প্যাটেল কাজলকে পাসপোর্ট তৈরি করে গুজরাটে চলে যেতে বলেন। কিন্তু কাজুলির মা-বাবা তাঁকে একজন বাংলাদেশি পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। কাজুলি পাসপোর্ট তৈরির জন্য একজন দালালকে ১২-১৩ হাজার টাকা দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হন।
পারিবারিক চাপের মুখে কাজুলি বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে কলকাতায় পৌঁছান এবং সেখান থেকে গুজরাটের আনন্দে চলে যান। এরপর তারা মালা বদল করে বিয়ে করেন। কাজুলি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘কাজল’ রাখেন।
প্রয়োজনীয় নথির অভাবে তাঁদের বিয়েটি আইনগতভাবে নথিভুক্ত হয়নি। তরুণ প্যাটেল বলেন, ‘আমরা কখনোই ভাবিনি যে বিষয়টি পরে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সেই পরিস্থিতিতে তাঁর পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে আনা সম্ভব ছিল না।’
মুসলিম ধর্মাবলম্বী কাজল বিয়ের পর হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেন বলেও জানান তরুণ। তাঁর আশঙ্কা, কাজলকে যদি নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়, তবে তাঁর মা-বাবা আর মেনে নেবেন না।
শোকাচ্ছন্ন পরিবার
কাজল গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তরুণ ও তাঁর পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। কাজল বর্তমানে আনন্দের একটি নারী সুরক্ষা কেন্দ্রে আছেন। তরুণ বলেন, ‘আমার সন্তানরা প্রতিদিন কান্নাকাটি করছে, জানতে চাইছে তাদের মা কবে ফিরবে। আমার কাছে এর কোনো উত্তর নেই। তাঁকে যদি বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়, তবে আমাদের পরিবার পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।’
কাজলের শাশুড়ি ইন্দুবেন বলেন, ‘কাজল চলে যাওয়ার পর থেকে আমাদের পরিবারের কেউই ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করছে না। বাচ্চারা সারাক্ষণ কাঁদছে। কাজল আমার কাছে কেবল পুত্রবধূই ছিল না, ছিল আমার নিজের মেয়ের মতো।’
কাজলকে রাখা হয়েছে ‘জাগ্রুতি মহিলা সংগঠন’ নামে একটি হোমে। এর সভাপতি আশা দালাল বলেন, ‘কাজল সবসময় মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন এবং প্রায়ই কান্নাকাটি করেন। তিনি সবসময় তার পরিবারের কথা, বিশেষ করে দুই ছেলের কথা মনে করছেন। তাঁর একমাত্র ভয়, যদি বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়, তবে তিনি আর কখনোই ভারতে ফিরে আসতে পারবেন না।’
আইনি লড়াইয়ে প্যাটেল
বর্তমানে তরুণ প্যাটেলের একমাত্র লক্ষ্য, যেকোনো মূল্যে কাজলকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো থেকে আটকানো। এ জন্য তিনি সব পর্যায়েই বিষয়টি তুলে ধরছেন, এমনকি হাইকোর্টেরও দ্বারস্থ হয়েছেন।
তরুণের আইনজীবী জয়নব সাইয়েদ বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা আদালতে গিয়ে চেষ্টা করব আইনের মারফত কাজল যাতে ভারতের নাগরিকত্ব পেতে পারেন। সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এই অধিকার কেবল ভারতীয় নাগরিকদের জন্যই নয়, বরং ভারতে বসবাসকারী যে কারোর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই আমরা এই বিষয়গুলোই তুলে ধরব।’
জয়নব সাইয়েদ আরও বলেন, ‘কেউ যদি কোনো ভারতীয়কে বিয়ে করেন এবং বেশ কয়েক বছর পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন, তবে পরিস্থিতি ও প্রমাণ বিবেচনা করে তিনি নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠেন। আমাদের চেষ্টা থাকবে যাতে কাজলকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো না হয় এবং তিনি ভারতের নাগরিকত্ব পান।’
তরুণ প্যাটেল আনন্দ এলাকার সংসদ সদস্য মিতেশ প্যাটেলের কাছেও আবেদন জানিয়েছেন। বিবিসিকে মিতেশ প্যাটেল বলেন, ‘আমি দিল্লি গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে বিষয়টি তুলে ধরব।’
অপারেশন ডেল্টা হান্ট
গুজরাটের পুলিশ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে ‘অপারেশন ডেল্টা হান্ট’ নামে অভিযান শুরু করে। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ৩৬২ জন কথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে’ আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ১০৩ জন পুরুষ, ১৮৮ জন নারী এবং ৭১ জন শিশু ছিল।
এছাড়াও ৭৮২ জনেরও বেশি ‘সন্দেহভাজন বাংলাদেশি’ নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গুজরাট সরকারের এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সাহায্যে পুলিশ ভুয়া নথি সরবরাহকারী স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করে।
এর আগেও গুজরাটে কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের আটক করা হয়েছিল। এমনকি আহমেদাবাদের চান্দোলা হ্রদ এলাকায় পুলিশ বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযানও চালিয়েছিল।
