স্বচ্ছ বোতলে ভিটামিন ‘এ’ নষ্টের শঙ্কা, অস্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ের আহ্বান
৪৯ শতাংশ পরিবার এখনও খোলা ভোজ্যতেলের ওপর নির্ভরশীল
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ১৮:১৯
ভোজ্যতেলের পুষ্টিগুণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাজারজাতকরণের সব পর্যায়ে অস্বচ্ছ ও ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ে আলো প্রবেশের কারণে সমৃদ্ধকৃত ভোজ্যতেলের ভিটামিন ‘এ’ ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত অস্বচ্ছ প্যাকেজিং চালু করা প্রয়োজন।
মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল হলিডে ইনের কনফারেন্স রুমে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ ও মানসম্মত ভোজ্যতেল: বিশেষজ্ঞ সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।
লার্জ স্কেল ফুড ফর্টিফিকেশন–বাংলাদেশ কান্ট্রি অ্যাডভোকেসি প্রকল্পের কনসালটেন্ট এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মুশতাক হাসান মুহম্মদ ইফতিখারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে বিজ্ঞানী, গবেষক, ভোজ্যতেল রিফাইনারি প্রতিনিধি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন।
আলোচনায় বলা হয়, ভোজ্যতেলকে অধিক স্বচ্ছ করতে ২৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় পরিশোধন করা হলে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। এতে তেল গ্রহণকারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
খোলা ভোজ্যতেলের ব্যবহার প্রসঙ্গে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মলয় কান্তি মৃধা বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত ন্যাশনাল নিউট্রিশনাল সার্ভেইল্যান্সের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের ৫১ শতাংশ পরিবার প্যাকেটজাত ভোজ্যতেল ব্যবহার করলেও ৪৯ শতাংশ পরিবার এখনও খোলা ভোজ্যতেলের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভিটামিন ‘এ’ -সমৃদ্ধ ভোজ্যতেলের কার্যকারিতা বজায় রাখতে দ্রুত অস্বচ্ছ প্যাকেজিং চালু করা প্রয়োজন। তাদের মতে, দেশে এ ধরনের প্যাকেজিং প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে, ফলে এটি বাস্তবায়নে বড় কোনো প্রযুক্তিগত বাধা নেই।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) প্রতিনিধি এস. এম. আবু সাঈদ বলেন, ভোজ্যতেলের প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে ফুড-গ্রেড-সংক্রান্ত সনদ প্রোডাক্ট সার্টিফিকেশন কমিটি থেকে নিতে হয়। তবে ফুড-গ্রেড প্রতীক ব্যবহার এখনো বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
পথিকৃৎ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, বিভিন্ন ধরনের তেলের মানবস্বাস্থ্যের ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব রয়েছে। জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও পরিবর্তিত সংস্কৃতির প্রভাবও জনস্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বিষয়ে আরও জনস্বাস্থ্যভিত্তিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুলতান আলম বলেন, অনেক ডিও ডিলার ভোজ্যতেল পরিবহনে কেমিক্যাল বহনে ব্যবহৃত ড্রাম ব্যবহার করেন, যা শনাক্তের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এসব ড্রামে ভোজ্যতেল সরবরাহ বন্ধ করা গেলে তেলের গুণগত মান আরও উন্নত হবে। তিনি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করারও আহ্বান জানান।
সংলাপ শেষে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রিফাইনারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে শতভাগ অস্বচ্ছ ও ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় খোলা ভোজ্যতেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩-এর ধারা ৮ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি এবং ক্রুড ভোজ্যতেল আমদানির সময় বন্দরেই ভারী ধাতুর পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক মো. ইউনুছুর রহমান, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক মো. কুতুবুল আলম এবং টিকে গ্রুপের জিএম (কিউসি, কিউএ অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম।
- বিষয় :
- ভোজ্যতেল
- গোলটেবিল আলোচনা
- বিশেষজ্ঞ মত