ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতিতে নারীর দৃশ্যমান অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্তে বৈষম্যের অভিযোগ

রাজনীতিতে নারীর দৃশ্যমান অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্তে বৈষম্যের অভিযোগ
×

ছবি- সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:২৮ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:৩৫

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নারীদের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ বাড়লেও দলের নীতিনির্ধারণ, নেতৃত্ব ও নির্বাচনে মনোনয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাঁদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নেই বলে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নারী নেতারা। তাঁদের মতে, মিছিলের সামনে ব্যানার হাতে নারীদের দেখা গেলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তাঁদের জায়গা নিশ্চিত করা হয় না।

বৃহস্পতিবার নারীপক্ষ আয়োজিত তরুণ নারী সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। নরওয়ে দূতাবাস ও জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থার সহযোগিতায় মানিকগঞ্জের কৈট্টায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে দুই দিনের এ সম্মেলন শুরু হয়।

উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন নারীপক্ষের সভানেত্রী কে এ জাহান রুমী। সম্মেলনের উদ্দেশ্য, প্রকল্প পরিচিতি এবং নারী নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বিষয়ে সংগঠনের অবস্থান তুলে ধরেন সদস্য মাহীন সুলতান। তিনি বলেন, জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব এখনও কম। জুলাইয়ের আন্দোলনে তরুণ নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের ধরে রাখা যায়নি।

বিএনপি নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, বছরের পর বছর রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও নারীদের নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু নারীদের প্রস্তুত করলেই হবে না, পুরুষদের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।

নির্বাচনে নারীদের মনোনয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অভিজ্ঞতার অজুহাতে নারীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। একজন পুরুষ অভিজ্ঞতা ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে একজন নারীর ক্ষেত্রেও সেই সুযোগ থাকা উচিত।

নিজের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নিলুফার মনি জানান, ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি সামনের সারিতে ছিলেন। তখন আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাইলে তাঁকে ভিন্নভাবে দেখা শুরু হয়। তাঁর ভাষায়, মিছিলের সামনে থাকা নারীর জন্য গ্রহণযোগ্য হলেও নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় যেতে চাওয়াকে যেন অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে।

এনসিপি নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারীর বসা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু সমাজে নারীকে প্রতিনিয়ত নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়।

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি ও প্রকৃত ক্ষমতায়নের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, মিছিলের সামনে ব্যানার ধরার সুযোগকে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে মনোনয়ন, নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয় না।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সংসদ ও রাজনৈতিক দলগুলোতে এখনও পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো বিদ্যমান বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ না করে কমিশনকে ঘিরে নাটক করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থার প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং বলেন, তরুণ নারীদের ওপর বিনিয়োগ মানে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রে বিনিয়োগ। তরুণ নারী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে আন্তদলীয় ও আন্তপ্রজন্ম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

সম্মেলনের বিভিন্ন পর্ব সঞ্চালনা করেন নারীপক্ষের সদস্য কামরুন নাহার ও সামিয়া আফরীনসহ অন্যরা। বক্তব্য দেন লেখক ও মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান, জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থার কর্মসূচি ব্যবস্থাপক তপতী সাহা এবং সাংস্কৃতিক কর্মী বীথি ঘোষসহ অনেকে। 

সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বিভিন্ন পেশার শতাধিক নারী তরুণ নারীদের প্রতিবন্ধকতা, সম্ভাবনা ও অবদান নিয়ে মতামত তুলে ধরছেন। শুক্রবার বিকেলে সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

আরও পড়ুন

×