বিশেষ সাক্ষাৎকার
তাদের আত্মত্যাগ সার্থক হোক
শেখ রোকন
প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:২৫
প্রকৌশলী রবিউল আফতাব পিইঞ্জ. শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশার কনিষ্ঠ পুত্র।
তার ডাকনাম বুলবুল। ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে
সংঘটিত গণহত্যা এবং অধ্যাপক পিতাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এখনও তার
স্মৃতিতে দগদগে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বুলবুলের বয়স ছিল ছয় বছর। তিনি
ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও ঢাকা কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন
করেন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনোয়ার
পাশা ভবনে সমকালের সঙ্গে রবিউল আফতাবের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে শহীদ
বুদ্ধিজীবী পরিবারের ট্র্যাজেডি, সংগ্রাম ও প্রত্যাশা।
সমকাল :শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারগুলোর মধ্যে আনোয়ার পাশার পরিবারকে জনপরিসরে অপেক্ষাকৃত কম দেখা যায়। কোনো বিশেষ কারণ?
রবিউল আফতাব :মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘসময় আমরা আসলে পারিবারিকভাবে এমন একটা
সংগ্রামের মধ্যে ছিলাম যে, সামাজিকতার বিষয়গুলোতে খুব বেশি মনোযোগ দিতে
পারিনি। গত কয়েক বছর ধরে বাবার সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, আদর্শ ও লেখালেখি নিয়ে
কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার
চেষ্টা করছি। এই রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে তার চিন্তা-ভাবনার অনেক নতুন দিক
উন্মোচিত হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে বাবা এমন
কিছু কাজ ও লেখালেখি করেছিলেন, সেগুলো দীর্ঘদিন আড়ালে পড়ে ছিল। অনেকে হয়তো
জানেন না, তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। বাবার অবদান ও
ভূমিকার অনেক কিছু আমাদেরও অজানা ছিল। এখন সেগুলো সামনে আসছে। আমি সেগুলো
সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রকাশের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন মনে হচ্ছে,
এগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জানা উচিত। বুদ্ধিজীবীরা কেন দেশের জন্য প্রাণ
দিয়েছিলেন তা সবার জানা উচিত।
সমকাল :পারিবারিক সংগ্রামের কথা বলছিলেন...
রবিউল আফতাব :শুধু আমরা নই, কমবেশি সব শহীদ পরিবারই ভয়াবহ সংগ্রামের মধ্য
দিয়ে গেছে। পরিবারের মূল ব্যক্তি যখন আকস্মিকভাবে শহীদ হন, তখন গোটা পরিবার
অথৈ সাগরে পড়ে যায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আরও নানারকম চ্যালেঞ্জ থাকে। আমার
মনে হয়, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা। এত রক্ত, লাশ ও
স্বজনের ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখার পর কারও মানসিক পরিস্থিতি দৃঢ় থাকার কথা নয়।
বিশেষ করে মায়েদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয় ছোট ছোট সন্তানকে মানুষ করা,
তাদের খাওয়া-পরা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা। আমার বড় ভাই তখন ঢাকা কলেজে পড়ত।
স্বাধীনতার পর একটি অস্থির সময়। ১৯৭২ সালে একটি ঘটনার মানসিক ধাক্কা সে
কখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাকে বামপন্থি হিসেবে ভিত্তিহীন সন্দেহে পুলিশ
ধরে নিয়ে গিয়েছিল। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু
সাঈদ চৌধুরীর হস্তক্ষেপে ছাড়া পায়। খুবই মেধাবী ছাত্র ছিল সে। কিন্তু
মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে এবং পরবর্তী সময়ে বিদেশে গিয়েও পড়াশোনা সম্পূর্ণ
করতে পারেনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়েছে। আমি ঢাকা কলেজে ও
বুয়েটে পড়েছি। একটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক চাপের মুখে আমাদের পড়াশোনা করতে
হয়েছে। ক্যারিয়ার গড়তে হয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর
মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন মনোযোগ ছিল না;
বরং তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
সমকাল :বাবা আনোয়ার পাশাকে যখন ধরে নিয়ে যায়, তখন আপনি শিশু মাত্র। বাবার সঙ্গে কোন স্মৃতি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?
রবিউল আফতাব :সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার স্মৃতি।
নীলক্ষেত আবাসিক এলাকায় আমাদের কোয়ার্টার থেকে তিনি আমাকে ইউল্যাব স্কুলে
নিয়ে যেতেন ও আসতেন। ওই পথটুকু যেতে আমার খুব আনন্দ হতো। তিনি ছিলেন খুবই
মানবিক মানুষ। সন্তানদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশতেন। আরেকটি মজার স্মৃতি মনে
পড়ে। তিনি রেডিওতে অনুষ্ঠান করতেন, আমরা শুনতাম। ফিরলে আমি জানতে চাইতাম-
তিনি ছোট রেডিওর ভেতরে কীভাবে প্রবেশ করতেন?
সমকাল :২৫ মার্চের কালরাতের কথা মনে আছে?
রবিউল আফতাব :স্পষ্ট মনে আছে। সেই ভয়াবহ রাতের কথা ভোলা যায়! তখনকার ইকবাল
হল, এখনকার জহুরুল হক হলের পাশে আমাদের বাসা ছিল। চারতলায় থাকতাম আমরা। ২৫
মার্চের রাতে চারপাশে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ। আমাদের ঘর, আসবাবপত্র কেঁপে
কেঁপে উঠছিল। বাবা-মাসহ আমরা খাটের নিচে লুকিয়েছিলাম। সিঁড়িতে ভারী বুটের
শব্দ, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল- সব মনে আছে। ২৬ মার্চ সকালে জানালার ফাঁক
দিয়ে দেখেছিলাম জহুরুল হক হল থেকে লাশের স্তূপ গাড়িতে তোলা হচ্ছে। বাসার
ছাদ থেকে নেমে এসে বাবা বলেছিলেন, সেখানে অনেক লাশ। নিচতলায় একজন অধ্যাপক
একাই থাকতেন কাজের একজন লোকসহ। তার স্ত্রী পিএইচ.ডি করতে বিদেশে গিয়েছিলেন,
মনে আছে। ওই কাজের লোক কাঁদছিল যে, তার সাহেবকে মেরে ফেলেছে মিলিটারিরা।
তারও পায়ে গুলি লেগেছে। ২৭ তারিখ কারফিউ উঠে গেলে আমরা সবাই
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে এক আত্মীয়ের বাসায় চলে গিয়েছিলাম। দুই মাস পরে ফিরে
এসেছিলাম ঈসা খাঁ রোডের একটি বাসায়।
সমকাল :আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন ফিরে এসেছিলেন? কেন ঢাকার বাইরে চলে যাননি? আপনার মায়ের কাছে কখনও জানতে চেয়েছেন?
রবিউল আফতাব :এই প্রশ্ন পরে আমার মনেও জেগেছিল। মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
বাবা মনে করতেন, দেশের ভেতরে থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করা সম্ভব।
পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধে আমার বাবার ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন অধ্যাপক ওয়াকিল
আহমেদ। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ অধ্যাপক
মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা বক্তৃতামালা আয়োজন করে।
ওই বক্তৃতামালা পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশ হয়। সেখানে বলা হয়- আনোয়ার পাশা
নিজের টাকা ছাড়াও ওয়াকিল আহমেদসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যান্য অধ্যাপকের
কাছ থেকে অর্থ সাহায্য সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি গোপন প্রচারপত্রে নিয়মিত লিখতেন। এ সময় ঢাকায় যা
দেখেছেন, সেগুলোরই জীবন্ত বর্ণনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই 'রাইফেল রোটি
আওরাত' উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলেন। একটি টাইপরাইটার কিনেছিলেন
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারপত্র তৈরি করার জন্য।
সমকাল :আপনার দাদাবাড়ি তো ভারতের মুর্শিদাবাদে। তবু তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে যাননি!
রবিউল আফতাব :হ্যাঁ, শুধু তাই নয়। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও
ছিলেন; কিন্তু ভারতের ব্যাপারে আসলে বাবার মনে সম্ভবত একধরনের অভিমান ছিল।
নিজেই আক্ষেপ করে ডায়েরিতে লিখেছেন, ভারতে আমাকে বলা হতো তুমি মুসলমান। এ
দেশ তোমার নয়। আবার পাকিস্তানে বলা হয়, আমি যথাযথ মুসলমান নই। ভারতের
মানুষ।
সমকাল :আমরা জানি, তিনি আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন।
রবিউল আফতাব :অবশ্যই। দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় আমার বাবা অনেক
দুঃসাহসিক ভূমিকা রেখেছেন। একটি ঘটনার কথা আমরা জানতাম না। সাংবাদিক রণেশ
মৈত্র লিখেছেন। ঘটনাটি ১৯৬২ সালের এপ্রিল মাসের। তিনি তখন এডওয়ার্ড কলেজে
বাংলার শিক্ষক। তখন পাবনা শহরে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। দাঙ্গার
ওই রাতে তিনি কলেজের হিন্দু হোস্টেলে ছুটে গিয়েছিলেন। ছাত্ররা কলেজের
অধ্যক্ষের কাছে গিয়ে প্রাণ বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিল। অধ্যক্ষ সাড়া দেননি।
আনোয়ার পাশা নাইটগার্ডকে ডেকে এনে কলেজে ক্লাসরুম খুলে হিন্দু ছাত্রদের
ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে বারান্দায় পাহারা দেন। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে সবার
জন্য কলা-রুটি কিনে দেন। দাঙ্গাকারীরা ফাঁকা হিন্দু হোস্টেলে এসে ভাঙচুর
করে চলে গিয়েছিল। ছাত্রদের তিনি সবসময় সন্তান মনে করতেন। অন্যান্য অবদান
ছাড়াও শুধু শিক্ষক হিসেবেই তিনি ছিলেন সার্থক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার
সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল। তিনি তখন আমার বাবার ক্লাস উপভোগ করার কথা
বলেছিলেন।
সমকাল :রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কাজ করতে গিয়েও তো তিনি সরকারের রোষের মুখে পড়েছিলেন?
রবিউল আফতাব :হ্যাঁ, ষাটের দশকে রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের
নিষেধাজ্ঞা ছিল। ওই সময় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে ১৯৬১ সালে তিনি
পাবনায় এডওয়ার্ড কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান
করেন। এর ফলে গোয়েন্দারা তাকে নানারকম জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তার পাসপোর্ট ছয়
বছরের জন্য স্থগিত হয়ে গিয়েছিল।
সমকাল :শহীদ বুদ্ধিজীবীদের এসব অবদান ও আত্মত্যাগ কি মূল্যায়িত হয়েছে?
রবিউল আফতাব :শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অবদানের সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু
মুক্তিযুদ্ধের সময় নয়, সারাজীবন ধরে তারা যে আদর্শিক লড়াই করেছেন; একটি
উদার, মানবিক সমাজ গঠনে কাজ করছেন, সেগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে
হবে। সবচেয়ে বড় মূল্যায়ন হবে, যে জন্য তারা জীবন দিয়েছেন, সেই স্বাধীনতার
সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। স্বাধীনতার সুফল সবার ঘরে পৌঁছলেই তাদের
আত্মত্যাগ সার্থক হবে।
সমকাল :আপনার বাবার সাহিত্যকর্ম ও অন্যান্য অবদান সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন?
রবিউল আফতাব : না, সেভাবে ভাবছি না। কারণ এর জন্য যে সামর্থ্য প্রয়োজন,
সেটা আমাদের নেই। তার ব্যবহূত টাইপরাইটারটি ইতিমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে
প্রদান করেছি। তার অন্যান্য স্মারকও সেখানে জমা দেওয়ার কথা ভাবছি। তবে
বইগুলো যাতে বাজারে সহজলভ্য হয়, সেজন্য স্টুডেন্টওয়েজ প্রকাশনীর সঙ্গে কাজ
করছি। তাদের ধন্যবাদ জানাই।
সমকাল : আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
রবিউল আফতাব : সমকালকেও ধন্যবাদ জানাই।
- বিষয় :
- বিশেষ সাক্ষাৎকার
