অমর একুশে গ্রন্থমেলা
নতুন বই নিয়ে ধন্দে পাঠক
জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:০৭
মেলার একটি প্যাভিলিয়নের সামনে থরে থরে সাজানো বই ঘুরেফিরে দেখছিলেন গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে আগত স্কুলশিক্ষক আবদুল কাদির। পঞ্চাশোর্ধ্ব শিক্ষকের হাতে বইয়ের 'ফর্দ'। অনেকক্ষণ ঘেঁটেও কাঙ্ক্ষিত বই পছন্দ করতে পারছিলেন না। অন্য স্টলের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলতে লাগলেন।
কাছে গিয়ে আলাপ শুরু করলে তিনি বলেন, যাচ্ছেতাই বই হচ্ছে। প্রবন্ধ, ভ্রমণ, মুক্তিযুদ্ধসহ নানা বিষয়ের বই কেনার চেষ্টা করছি। কিছু বইয়ের মলাট দেখে ভালো লাগে। ভেতরে একটু পড়তে গেলেই সেটি কেনার ইচ্ছে হারিয়ে যায়।
এই শিক্ষকের মতোই অবস্থা অনেক পাঠক ও গ্রন্থানুরাগীর। অমর একুশে গ্রন্থমেলার সময় অর্ধেক অতিবাহিত হয়েছে। প্রতিদিন মেলায় পাঠক ও ক্রেতার সমাগম দেখা যাচ্ছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকেও পাঠক বই কিনতে আসছেন। দিন যত এগিয়ে যাচ্ছে, মেলা জমে উঠছে।
অধ্যাপক ও লেখক আবুল কাসেম ফজলুল হক সমকালকে বলেন, মেলার শুরুটা হয় দর্শনার্থীর ভিড় দিয়ে। শেষদিকে আসতে শুরু করেন প্রকৃত ক্রেতারা। তবে এবার মেলায় মানসম্মত বই খুব একটা চোখে পড়ছে না। প্রতিদিন অনেক নতুন বই প্রকাশিত হলেও মান নিয়ে ধন্দে পড়ে যান পাঠকরা।
এই লেখকের মন্তব্যের সত্যতা মেলে প্রকাশক, বিক্রয়কর্মী এবং অনেক ক্রেতার সঙ্গে আলাপকালে। তারা বলছেন, অনেকে অতি উৎসাহী হয়েও আজকাল বই বের করছেন। নামি প্রকাশনা সংস্থাও মানের দিক বিবেচনা না করে বই করে থাকেন। ফলে বই প্রকাশের ক্ষেত্রে কাউকে কোনোরকম 'পরীক্ষা'র মুখে পড়তে হয় না।
শিশু চত্বরের সামনে কথা হয় গুলশান থেকে আসা ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে মেলায় এসেছিলেন গত শনিবার। সন্তানদের পছন্দ অনুযায়ী কয়েকটি বই কিনেছেন। নামি লেখকরাও শিশুতোষ গ্রন্থ করছেন দেখে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি। তবে আমিনুল বলেন, হাতেগোনা কয়েকটি বই বাদে সবই মানহীন। মলাট ওল্টালেই ভেতরে বোঝা যায় বইয়ের কী অবস্থা। বিশেষ করে শিশুতোষ গ্রন্থের ক্ষেত্রে মানের দিকে যথেষ্ট খেয়াল রাখা সবার দায়িত্ব।
'শিশুরা কোন ধরনের বই খুঁজছে?'- এ প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলেন ইকরি মিকরি প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী বিপ্লব মিয়া। পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনের বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, 'শিশুরা বই বা লেখার মান বোঝে না। তারা দেখে প্রচ্ছদ কতটা রঙিন। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, একটু বড় হয়েছে যেসব শিশু ওরা এসেই ডাইনোসরসহ নানা প্রাণীর নাম বলে, সে ধরনের বই কেনার বায়না ধরে। তাতে মনে হয়েছে, নতুন প্রজন্ম দেশীয় সংস্কৃতি থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে।'
বই প্রকাশের আগে মান দেখবে কে, সে বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। যদিও প্রতিবছর মেলা শেষে 'মানসম্মত' বইয়ের একটি সংখ্যা প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি। গত দুই বছরের হিসাব সামনে আনলে দেখা যায়, ২০১৮ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় নতুন বই প্রকাশ হয়েছিল চার হাজার ৫৯১টি। মেলাশেষে মাত্র ৪৮৮টি বইকে 'মানসম্মত' ঘোষণা দেয় একাডেমি; যা মোট প্রকাশিত বইয়ের মাত্র ১০.৬৩ শতাংশ। গতবছর মানসম্মত বইয়ের হার প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়ে হয় ২৪.৫৭ শতাংশে। সেবারের গ্রন্থমেলায় নতুন প্রকাশিত চার হাজার ৬৮৫টি বইয়ের মধ্যে মানসম্মত ছিল এক হাজার ১৫১টি।
চলতি মেলায় গতকাল পর্যন্ত ১৬ দিনে প্রকাশিত নতুন বইয়ের সংখ্যা দুই হাজার ৪৭৫টি। মেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে না কতটি মানসম্মত। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে গল্প ৩৩৮, উপন্যাস ৩৯৯, প্রবন্ধ ১৩৫, কবিতা ৭২০, গবেষণা ৪৭, শিশুসাহিত্য ১০৮, ছড়া ৪৭, মুক্তিযুদ্ধ ৮৮, বিজ্ঞান ৫২, বঙ্গবন্ধুবিষয়ক ৭৫, অনুবাদ ২৭ এবং সায়েন্স ফিকশনের বই ৪১টি।
উৎস প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা সেলিম বলেন, কোনো প্রকাশকের দ্বারাই বইয়ের মান নির্ধারণ করে দেওয়া সম্ভব নয়। এটি পারে একমাত্র বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রকাশিত নতুন বইয়ের নামসহ বিস্তারিত মাইকে ঘোষণা করে দেওয়া হয়। সেখানে যদি শুধু ভালো মানের বইগুলোর নাম ঘোষণা করার ব্যবস্থা হয়, তাহলে লেখক-প্রকাশকদের মধ্যে কিছুটা হলেও দায়িত্ববোধ কাজ করতে পারে।
নতুন বই: গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ১৩৫টি। এ নিয়ে নতুন বইয়ের সংখ্যা দুই হাজার ৪৭৫টি। উল্লেখযোগ্য হলো- সৈয়দ শামসুল হকের 'জলেশ্বরী' (পাঠক সমাবেশ), নির্মলেন্দু গুণের 'বৈঠকখানায়' (কথাপ্রকাশ), সৈয়দ ইকবালের 'মেয়ে তুমি জাঞ্জিবার টরন্টো' (রয়েল পাবলিশার্স), মঈনুস সুলতানের 'মেকং পাহাড়ের মন্দির-মুগ্ধ লোকালয়ে' (উৎস প্রকাশন), হাফিজ রশিদ খানের 'রাতে আমার পেখম মেলে' (আগামী), সুমন্ত আসলামের 'বৃষ্টি তোমার জন্য' (অন্যপ্রকাশ), পিয়াস মজিদের 'মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলা একাডেমি' (বাংলা একাডেমি), শারমিন শামসের 'পাপ ও পারফিউম' (মাওলা ব্রাদার্স), হারুন-অর-রশিদের '৭ই মার্চের ভাষণ কেন বিশ্ব-ঐতিহ্য সম্পদ :বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ' (বাংলা একাডেমি), অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের 'বাংলাদেশ ও মুসলিম বিশ্ব (পুঁথিনিলয়), মোহিত কামালের 'তরুণদের ৭১ গল্প' (বিদ্যা প্রকাশ), সেলিনা হোসেনের 'পূর্ণ ছবির মগ্নতা' (পুঁথিনিলয়), হানিফ সংকেতের 'টনক নড়াতে টনিক' (অনন্যা), আলী ইমামের 'নানা দেশের রং বেরঙের গল্প' (সুলেখা প্রকাশনী), অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'উদ্ভিদ বিজ্ঞান পরিভাষা'(গ্রন্থকুটির), আযীমুল হকের 'ডুবে যেতে যেতে' (অন্যপ্রকাশ), অরবিন্দ মিত্রের 'ডা. এ.পি.জে. আবদুল কালাম' (গ্রন্থকুটির), মান্নান খানের 'তার একলা জীবন' (প্রকৃতি), বাবুল আনোয়ারের 'জোছনায় অবগাহন' (পুঁথিনিলয়)।
মঞ্চের আয়োজন: বিকেল ৪টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ রচিত '৭ই মার্চের ভাষণ কেন বিশ্ব-ঐতিহ্য সম্পদ : বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম। আলোচনায় অংশ নেন ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ এবং ড. কুতুব আজাদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি আসলাম সানী, সঞ্জীব পুরোহিত, ফারহানা রহমান এবং আহম্মেদ শরীফ।
কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি মুজিবুল হক কবীর, আয়শা ঝর্না, চঞ্চল আশরাফ এবং মাজুল হাসান। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মেহেদী হাসান, তিতাস রোজারিও এবং সিদ্দিকুর রহমান পারভেজ। গতকাল ছিল সাইমন জাকারিয়ার পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন 'ভাবনগর ফাউন্ডেশন'-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন আলম দেওয়ান, মোক্তার হোসেন, রহিমা খাতুন, শারমিন সুলতানা এবং মো. মাহাবুল ইসলাম। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন পুলিন চক্রবর্তী (তবলা), মো. হাসান মিয়া, (বাংলা ঢোল), আনোয়ার সাহদাত রবিন (কি-বোর্ড) এবং মো. খোকন (বাঁশি)।
