প্রকাশ:
২৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:০২ | আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:০৯
স্কুলের কাছেই সড়কের মোড়ে পড়ে ছিল আবীর হোসেনের রক্তাক্ত দেহখানি। গায়ে জড়ানো কালো পাঞ্জাবিতে তখনও ঘাতক লরির চাকার স্পষ্ট ছাপ। পিঠের ওপর দিয়ে ডানহাত পর্যন্ত উঠে গেছে চাকা। এরপর থেঁতলে দিয়েছে তার মাথা। পিচঢালা সড়কে ছড়িয়ে ছিল রক্ত আর ছিন্নভিন্ন মগজ।
১৫ বছর বয়সী আবীর পুরান ঢাকার ওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। ছয় দিন পরেই তার এসএসসি পরীক্ষা। গতকাল সোমবার স্কুলে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে ঢাকা ওয়াসার পানিবাহী একটি লরির ধাক্কায় চিরবিদায় নিয়েছে এই মেধাবী ছাত্র।
এমন মর্মান্তিক ঘটনার পর শুরুতে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন আবীরের সহপাঠী আর শিক্ষকরা। কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। পরে ক্ষুব্ধ হন, বিচার চেয়ে রাস্তায় নামেন। 'উই ওয়ান্ট জাস্টিস' ও 'আবীর হত্যাকারী ঘাতক চালকের ফাঁসি চাই'- স্লোগান তুলে পুরান ঢাকার সড়ক অবরোধ করেন তারা।
এ ঘটনায় বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বন্ধ করে প্রিয় ছাত্র আবীরকে চিরবিদায় দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে এবার ৫৬ শিক্ষার্থীর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। গতকাল স্কুল কর্তৃপক্ষ ৫৫ জনের হাতে তাদের প্রবেশপত্র তুলে দিয়েছে। শুধু ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ছাত্র আবীর হোসেনের প্রবেশপত্রটি জমা আছে প্রধান শিক্ষকের দপ্তরে।
আবীর হোসেন
দেড় বছর আগে রাজধানীর কুর্মিটোলার সড়কে বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হলে ঢাকার প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে। এরপর বিভিন্ন সময় মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা বিচার চেয়ে সড়ক অবরোধ করে। গতকাল আবারও সড়কে ঝরল শিক্ষার্থীর প্রাণ।
সহপাঠীরা জানিয়েছে, দুপুর ১২টার দিকে তাদের স্কুলে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ছিল। সাড়ে ১১টার দিকে বলধা গার্ডেনের পাশে ওয়ারী স্ট্রিটের সড়ক ধরে আবীর হেঁটে স্কুলে যাচ্ছিল। অদূরেই ঢাকা ওয়াসার পাম্প স্টেশন। সেখান থেকে পানিভর্তি একটি লরি পেছন দিকে যাওয়ার সময় আবীরকে ধাক্কা দেয়। সে পড়ে গেলে মাথার ওপর চাকা উঠিয়ে দিয়ে লরির চালক পালানোর চেষ্টা করে। স্থানীয় লোকজন ধাওয়া করে সেটি চালকসহ আটক করে।
ঘটনাস্থলের সামনেই এয়ার কন্ডিশন মেরামতের একটি দোকান। সেখানকার কর্মী রিফাত ইসলাম বলছিলেন, লরিটি পেছন দিকে যাচ্ছিল। পাঞ্জাবি পরা এক কিশোরকে সেটি ধাক্কা দিলে পড়ে যায় সে। এরপর চাকাটি মাথার ওপর উঠে যায়। আশপাশের লোকজন চিৎকার করলেও লরির চালক কিছুই শুনছিল না। যখন ঘটনা বুঝতে পারে, তখন সে পালানোর চেষ্টা করে। পরে তারা জানতে পারেন, নিহত কিশোর ওয়ারী স্কুলের ছাত্র।
খবর পেয়ে স্কুলের সামনে ছুটে আসেন আবীরের ব্যবসায়ী বাবা হানিফ মিয়াসহ আত্মীয়স্বজন। তাদের বিলাপে অন্য অভিভাবকরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। আবীরের বাবা বিলাপ করে বলছিলেন, তার আর কিছু রইল না। তিনি কী নিয়ে বেঁচে থাকবেন! এভাবে ছেলে তাকে ছেড়ে চলে যাবে জানলে নিজেই স্কুলে পৌঁছে দিতেন।
হানিফ মিয়া বলছিলেন, সকালে কাপ্তানবাজারের বাসা থেকে তিনি আবীরকে নিয়ে বের হন। জয়কালী মন্দির পর্যন্ত একসঙ্গে যান। এরপর আবীর অদূরেই তার স্কুলের দিকে চলে যায়। তিনি নবাবপুরে নিজের দোকানের দিকে যান। আবীর তখন বলেছিল, বিদায় অনুষ্ঠানের পর পরীক্ষার প্রবেশপত্র দেবে। সেটি নিয়ে বাসায় ফিরবে সে। কিন্তু আধাঘণ্টার মধ্যেই তিনি দুর্ঘটনার খবর পান।
১১ মাস আগে আবীরের মা মিনু বেগম হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর কয়েক বছর আগে আবীরের বড় ভাই ফয়সাল হোসেন গুলিস্তান পার্কের পুকুরে ডুবে মারা যায়। হানিফ মিয়ার সংসারে তারপরও ছিল দুই মেয়ে লিজা ও লিমা আর ছেলে আবীর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবীরকেও হারালেন তিনি।
ওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল কুদ্দুস সমকালকে জানান, এমন মর্মান্তিক ঘটনা শোনার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না। এটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। তার ছাত্রের কোনো দোষ ছিল না। উচ্চশিক্ষার জন্য ছেলেটাকে স্কুল থেকে বিদায় দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু চালকের খামখেয়ালির জন্য চিরবিদায় দিতে হলো।
স্কুলের অন্য একজন শিক্ষক মাহবুব সরদার বলছিলেন, আবীর ক্লাসের মেধাবী ছাত্র ছিল। সে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষায় তাদের স্কুল থেকে জিপিএ ৫ পাওয়ার মতো ছাত্র।
দুপুরে দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, তখনও আবীরের রক্ত আর বিচ্ছিন্ন মগজ পড়ে ছিল সড়কে। লোকজন তা পানি দিয়ে ধুয়ে দেয়। পুরো এলাকাটিই আবাসিক। তবে বসবাসের ভবনগুলোতে মার্কেট গড়ে ওঠায় সব সময়েই ওই এলাকায় পণ্যবাহী ভারী যান চলাচল করে। দুর্ঘটনার পর ওয়ারী স্কুল ছাড়া আশপাশের স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। এতে সায়েদাবাদ থেকে মতিঝিল ও গুলিস্তানমুখী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ ও শিক্ষকরা বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে উঠিয়ে দেয়।
ওয়ারী থানার ওসি আজিজুর রহমান জানান, ওয়াসার পানিবাহী লরিসহ (ঢাকা মেট্রো ঢ-১১-০১১৪) চালক চুন্নু মিয়াকে আটক করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।