ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

সিঁড়িতে কোল থেকে ছিটকে পড়ে কয়লা হয়ে যায় রুশদি

সিঁড়িতে কোল থেকে ছিটকে পড়ে কয়লা হয়ে যায় রুশদি
×

মায়ের কোলে রুশদি -ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ০৯:৫৫

জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত ও শহিদুল কিরমানি রনি দম্পতি থাকেন রাজধানীর মগবাজারে দিলু রোডের একটি বাড়িতে। বৃহস্পতিবার ভোরে ওই বাড়িতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে তাদের চার বছরের ছেলে এ কে এম রুশদিসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের সবার শরীর পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে।

এ আগুনে তারা স্বামী-স্ত্রী দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। জান্নাতের শরীরের ৯৫ শতাংশ ও রনির ৪৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। 

রনি স্বজনদের জানিয়েছেন, আগুনের খবর পেয়ে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে তিনি নিচে নামার চেষ্টা করেন। ছেলে রুশদি তার কোলে ছিল অন্ধকার সিঁড়িতে তিনি পা পিছলে পড়ে যান। এ সময় রুশদি কোল থেকে ছিটকে পড়ে। হামাগুড়ি দিয়ে ছেলেকে খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্ত ছেলেকে পাননি। এরই মধ্যে স্বামী-স্ত্রী ও দগ্ধ হন।

এই সিঁড়িতে হাত থেকে ফসকে গিয়ে পুড়ে কয়লা হয়ে যায় রুশদি। ছবি: সমকাল

এ ঘটনায় মারা যাওয়া অপর দু'জন হলেন- এইচএসসি পরীক্ষার্থী আফরিন জাহান যুঁথী (১৭) ও আব্দুল কাদের লিটন (৪০)। এ অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়েছেন ওই বাড়ির আরও চার বাসিন্দা। তারা হলেন- কাঁচামাল ব্যবসায়ী মনির হোসেন (৪০), তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার (৩০), ছেলে মাহমুদুল হাসান (৯ মাস) ও মাহাদি হাসান রিফাত (৯)। মনির হোসেন পরিবার নিয়ে পাঁচতলায় থাকেন। 

বাড়িটির তৃতীয় তলায় জান্নাত-রনি দম্পতি ভাড়া থাকেন। আফরিন জাহান যুঁথী পাঁচতলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন এবং আব্দুল কাদের লিটন থাকতেন ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে। তিনি ওই ভবনের ২য় তলার ক্লাসিক ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি বায়িং হাউসের অফিস সহকারী ছিলেন।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, ভোর ৪টার দিকে দিলুরোডের ৪৫/এ নম্বর ছয়তলা বাড়ির নিচতলার গ্যারেজ থেকে প্রথমে আগুন লাগে। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে উপরতলায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০ টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এর আগেই আগুনে পুড়ে শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়। দগ্ধ জান্নাত ও তার স্বামী রনিসহ ছয়জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। 

তাদের মধ্যে জান্নাত ও রনির অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাড়িটির গ্যারেজে থাকা পাঁচটি প্রাইভেটকার ও দুইটি মোটরসাইকেল একেবারে পুড়ে গেছে। আগুনের সূত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। তবে প্রত্যক্ষদর্শী বাড়িটির দারোয়ান লুৎফর রহমান জানিয়েছেন, বৈদ্যুতিক সুইচ বোর্ড থেকে তিনি আগুন লাগতে দেখেছেন।

দারোয়ান লুৎফর রহমান সমকালকে বলেন, বাড়িটির নিচতলার একটি কক্ষে ১৪ বছর বয়সী নাতি সিফাতকে নিয়ে বুধবার রাতে ঘুমিয়েছিলেন তিনি। ভোর ৪টার দিকে হঠাৎ শব্দ শুনে ঘুম ভাঙে তার। দ্রুত বাইরে বের হয়ে দেখেন, বৈদ্যুতিক সুইচ বোর্ডে ও তার পাশে রাখা একটি কাঠের খাটে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। ঘর থেকে নাতি সিফাতকে ডেকে এনে বাইরে বের হয়ে চিৎকার শুরু করেন তিনি। ভবনটির বাসিন্দারাসহ আশপাশের লোকজন জেগে ওঠেন তার চিৎকারে। এরই মধ্যে গ্যারেজে পার্কিং করে রাখা পাঁচটি প্রাইভেটকার ও দুইটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরে যায়। তিনি চিৎকার করে উপরতলার লোকজনকে নিচে নেমে আসতে নিষেধ করে ছয়তলায় উঠতে বলেন। এরপর একে একে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট সেখানে ছুটে আসে। গলির মুখে গেট থাকায় পানিবাহী গাড়ি বাড়ির কাছে পৌঁছাতে পারেনি। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে পানির পাইপ টেনে নিয়ে আগুন নেভানো হয়।

ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা জানান, যারা ছয়তলায় উঠে পড়েছিল তাদের তেমন ক্ষতি হয়নি। ধোঁয়ায় সমস্যা হয়েছে তাদের। জান্নাত, তার স্বামী রনি, ছেলে রুশদি এবং কলেজ ছাত্রী আফরিন জাহান যুঁথী নিচে নামার চেষ্টা করেছিলেন। এ কারণে তারা আগুনের মধ্যে পড়ে যায়। যুঁথী, রুশদি ও আব্দুল কাদের পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। আব্দুল কাদের নিচতলার ঘরে থাকায় তিনি বের হতে পারেননি। ঘটনাস্থল থেকে তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। জান্নাত ও তার স্বামী রনিকে দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। 

ছয়তলা থেকে মনির হোসেন, তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার, ছেলে মাহমুদুল হাসান ও মাহাদি হাসান রিফাতকে উদ্ধার করা হয়। ধোঁয়ায় অসুস্থ হওয়ায় তাদেরও বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে।

রনির স্বজনরা জানান, রনির গ্রামের বাড়ি নরসিংদি শিবপুর উপজেলার ইটনা গ্রামে। তিনি ভিআইভিপি এসেড ম্যানেজমেন্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ফিন্যান্স ম্যানেজার ও পাশাপাশি আইসিএমএ এর লেকচারাল ছিলেন। তার স্ত্রী জান্নাত বেক্সিমকো'র অ্যাকাউন্ট অফিসার। তাদের একমাত্র ছেলে রুশদি দিলুরোডের একটি স্কুলে পড়ত।

আফরিন জাহান যুঁথির লাশ প্রথমে অজ্ঞাত থাকলেও বেলা ১০টার দিকে পরিচয় সম্পর্কে জানা যায়। তিনি ভিকারুননিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। তার বাবা জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি গণপুর্ত বিভাগের কর্মকর্তা। যে বাড়িতে আগুন লেগেছে, সেই বাড়ির পাঁচতলায় দুইসন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন। ভোরে আগুন লেগেছে, এমন চিৎকার শুনে তাদের ঘুম ভাঙে। এরই মধ্যে ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে তাদের ঘর। এ সময় তার মেয়ে যুঁথী গেট খুলে নিচে নেমে যান। স্ত্রী ও ছেলেসহ তিনি পাশের ভবনের ছাদে চলে যান। ছাদে পড়ে গিয়ে তার স্ত্রীর পা ভেঙে গেছে। তাকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরে হাসপাতালে যুঁথীর লাশ পাওয়া যায়। পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। তাদের গ্রামের শেরপুরে।

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যায় তিনজনের তাদের স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×