ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে বাজারে অভিযান

করোনা আতঙ্কে নিত্যপণ্যের দোকানে ক্রেতার ভিড়

করোনা আতঙ্কে নিত্যপণ্যের দোকানে ক্রেতার ভিড়
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২০ | ০৯:২৭

করোনাভাইরাস আতঙ্কে নিত্যপণ্যের কেনাকাটা বেশ বাড়ছে বাজারে। অনেকে মাত্রাতিরিক্ত কিনছেন। তাদের আশঙ্কা দাম আরও বাড়তে পারে। ফলে আগেই কিনে মজুদ করছেন। যদিও সরকার ক্রেতাদের আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি পণ্য না কেনার আহ্বান জানিয়েছে। তার পরও বাজার বেশ অস্থির। এটা আরও প্রকট হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে নিত্যপণ্যের অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের ধরতে বাজারে বিশেষ অভিযানে নেমেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। বুধবার সংস্থার সাতটি টিম রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে অভিযান চালায়। অভিযানে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি আইন অমান্য করায় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়।

এদিকে বাজার থেকে অতিরিক্ত পণ্য কিনে অস্থিরতা সৃষ্টি না করার জন্য ক্রেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি হুঁশিয়ার করেছেন- নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এর পরেও পণ্যের দাম বাড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

করোনা আতঙ্ককে পুঁজি করে চালের দাম না বাড়াতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায়ী কারসাজি করে চালের দাম বাড়ালে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্রেতাদের জন্য ওএমএসে (খোলাবাজারে) চাল বিক্রি চলছে। সরকারের গুদামে চালের পর্যাপ্ত মজুদ আছে।

বুধবারও রাজধানীর খুচরা বাজার ও সুপারশপগুলোতে প্রচণ্ড ভিড় দেখা গেছে। ক্রেতা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন বিক্রেতারা। মিরপুর-১, কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল ও নিউমার্কেটসহ বেশ কয়েকটি বাজারের বিক্রেতারা জানিয়েছেন, গত তিন দিন ধরে সংরক্ষণ করা যায় এমন পণ্য বিক্রি বহুগুণ বেড়েছে। বাজার থেকে অনেকে বাড়তি কিনছেন চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মসলা, মাছ, মাংস ও লবণ। কেউ কেউ কিনছেন শিশু খাদ্য, জীবাণুনাশক ও শিশুদের ডায়াপার।

মিরপুরের উত্তর পীরেরবাগ বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ক্রেতারা একসঙ্গে বেশি পণ্য কেনায় পণ্য দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক দোকানি পাইকারি বাজার থেকে বাড়তি পণ্য আনলেও তা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর মিরপুরের সুপার শপ স্বপ্নের কর্মচারী মো. হাসান জানান, গত কয়েকদিন ধরে ক্রেতার ভিড় বেড়েই চলেছে। এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য বিক্রি বেশি হচ্ছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান সমকালকে বলেন, করোনাভাইরাস কতদিন থাকবে তা কেউ জানে না। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পণ্য কিনে বাজার অস্থির করা উচিত নয়। তিনি ভোক্তাদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্বাভাবিক কেনাকাটা অব্যাহত থাকলে প্রয়োজন মিটবে। তিনি বলেন, বাজার থেকে কোনো ক্রেতা অতিরিক্ত পণ্য কিনলে এবং কোনো ব্যবসায়ী মজুদ করে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে আইনের আওতায় আনা উচিত। তিনি এ জন্য সরকারের সংস্থাগুলোকে বাজার তদারকি জোরদার করার আহ্বান জানান।

বুধবার মিরপুর-১ নম্বর বাজারে আলিফ স্টোরের টাঙানো বোর্ডের মূল্য তালিকায় যে দাম ছিল, তার চেয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে। চীনা রসুনের কেজি ১৫০ টাকা মূল্য দেওয়া থাকলেও ১০ টাকা বাড়িয়ে ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়। একইভাবে বাড়িয়ে ১২৫ টাকা কেজিতে কেনা আদার খুচরা মূল্য ১৪০ টাকা দেওয়া ছিল। কিন্তু ১৫০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। বিদেশি মসুর ডালের কেজি ৬৩ টাকা লেখা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়। শুধু এই আলিফ স্টোর নয়, এই বাজারের সব দোকানেই এভাবে বাড়তি দামে বিক্রি হয়েছে। এই বাজারের চালের আড়তে খুচরা ক্রেতার ভিড় ছিল। খুচরায় দাম বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজার থেকে অনেককেই দু'চার বস্তা করে চাল কিনতে দেখা যায়।

মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, যেসব ক্রেতা আগে এক বস্তা চাল নিতেন, তারা এখন দু'বস্তা নিচ্ছেন। এই বাজারের ব্যবসায়ী মো. মাসুম জানান, দোকানে ৫ লিটারের ভোজ্যতেল দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ক্রেতারা একসঙ্গে বাড়তি তেল নিয়ে যাচ্ছেন।

বাজারে তিন দিনের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৮ টাকা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মোটা চালের দাম। পাইকারিতেও বেড়েছে চালের দাম। এক সপ্তাহ আগেও প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) গুটি ও স্বর্ণা মোটা চাল এক হাজার ৪০০ টাকা ছিল। এখন তা এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৮৫০ টাকা হয়েছে। ভালো মানের মিনিকেটের বস্তা এখন তিন হাজার টাকা। যা আগে দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা ছিল। অন্যান্য চালের দামও একই হারে বেড়েছে। ভোজ্যতেলের দাম কোম্পানিগুলো না বাড়ালেও বাজারে বেড়েছে। গত সপ্তাহে পাঁচ লিটার বোতলজাত ভোজ্যতেল ৪৭০ থেকে ৪৮০ টাকায় বিক্রি হয়। এখন তা ৪৯০ থেকে ৫২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া খোলা সয়াবিন, পাম তেল, আটা-ময়দা, ডিম ও আলুর দামও কিছুটা বাড়তি। বিদেশি শিশুখাদ্য ও ডায়াপারের দামও বাড়তি বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তবে লবণ, পেঁয়াজসহ কিছু পণ্যের দাম স্বাভাবিক রয়েছে। খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ৯৬ টাকা লিটার। যা দু'দিন আগেও ৯০ থেকে ৯২ টাকা ছিল। আর ৮০ থেকে ৮২ টাকা দামের পাম তেল দাম বেড়ে ৮৪ থেকে ৮৫ টাকা হয়েছে। আটা ও ময়দার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। প্যাকেটজাত আটার দাম না বাড়লেও খোলা আটা দুই টাকা বেড়ে ২৮ থেকে ৩২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেজিতে তিন টাকা বেড়ে প্যাকেট ময়দা ৪৪ থেকে ৪৮ টাকা হয়েছে।

খুচরা বাজারে গতকাল নতুন দেশি রসুন ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। যা আগে ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকা। আলু কেজিতে পাঁচ থেকে সাত টাকা বেড়ে ২০ থেকে ২৫ টাকা হয়েছে। ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় এবং ফার্মের ডিম ডজনে ১০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা টিসিবির তথ্য অনুযায়ী- চাল, ডাল, আটা-ময়দা, আদা, মুরগি ও ডিমের দাম বেড়েছে। সব ধরনের চালের মধ্যে মোটা চালের দাম বেশি বেড়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চাল প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে।

আরও পড়ুন

×