ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

ছিন্নমূল, ভাসমান মানুষ রোজা ভাঙবে কী খেয়ে

ছিন্নমূল, ভাসমান মানুষ রোজা ভাঙবে কী খেয়ে
×

ফাইল ছবি

রাজিব আহাম্মদ

প্রকাশ: ০১ মে ২০২০ | ০৬:৩১

তৃতীয় বিশ্বের একটি গরিব দেশের শহর হলেও রাজধানী ঢাকায় রমজানে ইফতারে কেউ অভুক্ত থেকেছেন, এমন নজির হয়তো নিকট অতীতেও ছিল না। পথে পথে ইফতারি বিতরণ করা হতো ছিন্নমূল, গরিব ও ভাসমান মানুষের জন্য। কেনার সামর্থ্য না থাকলে অন্য কোথাও না জুটলেও মসজিদে মসজিদে ইফতারি প্রাপ্তি ছিল নিশ্চিত।

কিন্তু প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সব ওলটপালট করে দিয়েছে। ঢাকার বহু বছরের ঐতিহ্যকে থামিয়ে দিয়েছে। করোনার বিস্তার ঠেকাতে ঘরবন্দি হয়ে আছেন নগরবাসী। ইফতারির দোকানগুলো সব বন্ধ। বন্ধ ইফতার মাহফিল। এতে বিশেষ করে খুব দুর্ভোগে পড়েছেন গরিব, ছিন্নমূল ও ভাসমান মানুষ। যাদের কাজের কারণে পথে বেরোতেই হয়, ইফতারের সময় তাদেরও দুর্ভোগের অন্ত নেই। কারণ বোতলপানি বিক্রি হয় এমন দোকানও কোথাও খোলা থাকে না ওই সময়।

গত শনি ও রোববার ইফতারের আগে পুরান ঢাকা, গুলশান, তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগর ও ধানমন্ডি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পথে পথে ইফতারির জন্য অপেক্ষা করছেন অভুক্ত মানুষ। তাদের অধিকাংশই ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষ। ইফতারির দোকান সব বন্ধ। উপকরণ কিনে ঘরে ইফতারি বানিয়ে খাওয়ারও সামর্থ্য নেই তাদের। তা ছাড়া অধিকাংশের বাড়িঘরও নেই।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বিপরীতে ফুটপাথে বসে থাকতে দেখা যায় এক পরিবারকে। পাঁচ-ছয় বছর বয়সী শিশুটির হাতে একটি শরবতের বোতল। বাবা-মা বসে আছেন বিষণ্ণ মুখে। শিশুটির বাবার নাম কাজল মিয়া। 

তিনি জানালেন, থাকেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফুটপাথে। যখন যা কাজ পান, তাই করেন। করোনার আগেও খুব আরামে ছিলেন, তা নয়। কিন্তু করোনার কারণে তাদের চৈত্র-কার্তিক ১২ মাসই দুঃখের। তবু দু'বেলা খেতে পেতেন। কিন্তু করোনার কারণে ছুটি ঘোষণার পর একেবারেই কাজকর্ম নেই। এখন নিজেরা দূরে থাক, সন্তানের মুখে খাবারও দিতে পারছেন না। স্বামী-স্ত্রী দু'জনই রোজা রেখেছেন। ইফতারি কী দিয়ে করবেন তার ঠিক নেই। একটি গাড়ি থেকে একজন এক বোতল জুস দিয়ে গেছেন। তা ছেলেকে দিয়েছেন।

কাজল বলেন, এমন রোজার মাস তিনি জীবনে দেখেননি। ঢাকায় ১০-১২ বছর ধরে আছেন। ইফতারে কখনও অভুক্ত থাকেননি। রোজার দিন বিকেলে বা সন্ধ্যায় রাস্তায় বের হলেই কিছু না কিছু্‌ কেউ না কেউ দিতেন। কোথাও কিছু পাওয়া না গেলে মসজিদে, মাজারে খাবারের শতভাগ নিশ্চয়তা ছিল।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন কাঁটাবন মোড়ে মসজিদের সামনে ফুটপাতে ঝুপড়ি তুলে থাকা দুটি পরিবার। হুইল চেয়ারে করে ফুটপাথে সুঁই-তাগা বিক্রি করেন ট্রেনের ধাক্কায় চলৎশক্তি হারানো আজিবর। প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়ার পর থেকে ফুটপাতে থাকেন তিনি। 

আজিবর জানালেন, রোজার দিনে ইফতারির কোনো অভাবই হতো না। প্রচুর মানুষের কাছ থেকে দান পেতেন। সেহেরিরও অভাব হতো না। লোকজন সওয়াবের আশায় রোজায় হাত খুলে দান করে। কিন্তু এবার করোনার কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। দান করতে পারছেন না। এ কারণে বিপাকে পড়েছেন তার মতো গরিব, ছিন্নমূল মানুষেরা।

ধানমন্ডির জিগাতলার সরকারি কোয়ার্টারে মোড়ে এসে দেখা গেল ভ্যানে করে ইফতারি বিতরণ করা হচ্ছে। সেখানে লাইন ধরা মানুষের সংখ্যা দুই আড়াইশ'র কম হবে না। ফুটপাতে রিকশা-সাইকেল সারানোর মেকানিক বাবুল মিয়াও লাইনে আছেন। আছেন এটিএম বুথের পাহারাদারও। 

তারা জানালেন, কিনে খাওয়ার সামর্থ্য তাদের আছে। কিন্তু কিনবেন কোত্থেকে? সব তো বন্ধ। ঢাকায় তাদের পরিবার নেই, তাই বাসা থেকে রান্না করে আনবেন সেই উপায়ও নেই। আগে আশপাশের দোকানিরা তাদের ইফতারি দিতেন, এবার দোকানিরাও নেই। ঘোর সংকট চারদিকে।

আরও পড়ুন

×