ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাজেটে তামাকপণ্যে কার্যকর কর বৃদ্ধি চায় উবিনীগ ও তাবিনাজ

বাজেটে তামাকপণ্যে কার্যকর কর বৃদ্ধি চায় উবিনীগ ও তাবিনাজ
×

জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ১২:৪১ | আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ | ১২:৪২

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যে কার্যকর কর বৃদ্ধি ও কর কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব করেছে উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ) ও তামাকবিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ)। 

সংগঠন দুইটি বলেছে, বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং একটি সুস্থ জাতি গঠনের অঙ্গীকার করেছে। তা বাস্তবায়নে তামাকপণ্যে কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধি একটি অত্যন্ত ব্যয়-সাশ্রয়ী ও কার্যকর নীতি পদক্ষেপ। তাই, আগামী অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যে কার্যকর কর বৃদ্ধি ও কর কাঠামো সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

আজ রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে উবিনীগ ও তাবিনাজ আয়োজিত ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকপণ্যে কার্যকর দাম বৃদ্ধি: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নারীদের বাজেট ভাবনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রস্তাব করা হয়। 

এতে লিখিত বক্তব্য উত্থাপন করেন উবিনীগ ও তাবিনাজের সদস্য সীমা দাস সীমু। উপস্থিত ছিলেন তাবিনাজ সদস্য মরিয়ম মান্নান, পারভীন হাছান, ইয়াছমিন জাহান, বিলকিছ আক্তার বিথি, শারমিন কবির বীণা, মাহমুদা খাতুন, নিগার সুলতানা ও সামিয়া আফরিন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ উদ্বেগজনকভাবে কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের বিদ্যমান। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার আশেপাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের শরীরে উচ্চমাত্রার নিকোটিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা পরোক্ষ ধূমপানের ভয়াবহতা নির্দেশ করে। প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে অকালে মৃত্যুবরণ করছে। এই মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরও মারাত্মক সৃষ্টি করছে।

এতে বলা হয়, তামাকের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বিশাল ক্ষতি হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে তামাক ব্যবহার উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে একই সময়ে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, তামাক থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পায়, তার তুলনায় স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। ফলে তামাককে শুধু রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং এটি দেশের উন্নয়ন, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান তামাক কাঠামো অত্যন্ত জটিল এবং অকার্যকর। বিশেষ করে সিগারেটের চার স্তরবিশিষ্ট মূল্য কাঠামো-নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ এবং প্রিমিয়াম-তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে ব্যবহারকারীদের এক স্তর থেকে আরেক স্তরে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করেছে। নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের মধ্যে দামের পার্থক্য খুব কম হওয়ায় ধূমপায়ীরা সহজেই সন্তা বিকল্পে চলে যেতে পারে। একইভাবে জদা ও গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যও খুব সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করছে। বর্তমান কর কাঠামো সরকারকে কার্যকর রাজস্ব আহরণেও সহায়তা করতে পারছে না।

তারা আরও বলেন, বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তুলনায় সিগারেটের দাম তুলনামূলকভাবে কম হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক বছরে চাল, ডাল, তেল, ডিমসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম সেই তুলনায় খুব কম বেড়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সিগারেট আরো সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী সহজেই সিগারেট কিনতে পারছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যে কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা কমানো, সিগারেটের মূল্যস্তর হ্রাস করা এবং প্রতিটি প্যাকেটে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা। প্রস্তাব অনুযায়ী নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটকে একত্র করে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। উচ্চ স্তরের সিগারেটের মূল্য ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের মূল্য ২০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সব স্তরে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা কর কাঠামোর জটিলতা কমাবে এবং কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর করবে।

এতে বলা হয়, ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য কর বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার মূল্য ৬০ টাকা এবং গুলের মূল্য ৩৫ টাকা নির্ধারণ করে উভয়ের ওপর ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি প্রতি ১০ গ্রামে ২ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। একইভাবে বিড়ির ক্ষেত্রেও বিদ্যমান বিভাজন তুলে দিয়ে প্রতি ২০ শলাকা বিড়ির মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ এবং ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ বাহাত্তর হাজার তরুণ ধূমপান শুরু করা লাখো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে এবং প্রায় তিন থেকে নিরুৎসাহিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে সরকারের তামাক কর রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় হতে পারে। এই অতিরিক্ত অর্থ স্বাস্থ্যখাত সংস্কার, অসংক্রামক রোগ মোকাবিলা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয় কমাতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নারীদের বাজেট ভাবনার দৃষ্টিকোণ থেকে তামাকপণ্যে কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তামাকের ক্ষতির বড় অংশ বহন করেন নারীরা ও শিশুরা। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, পারিবারিক আয়, চিকিৎসা ব্যায় বাড়ে, এবং দরিদ্র পরিবারে পুষ্টি ও শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে তামাকপণ্যের দাম বৃদ্ধি কেবল জনস্বাস্থ্য রক্ষার পদক্ষেপ নয়; এটি নারী, শিশু ও পরিবারকেন্দ্রিক একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা উদ্যোগও বটে।

আরও পড়ুন

×