পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা
সারাদেশে প্রতিবাদ বিক্ষোভ অব্যাহত
ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক ও ভিসেরা প্রতিবেদন প্রস্তুত
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ১১:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর কন্যাশিশুকে হত্যার ঘটনায় ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক ও ভিসেরা প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্ত হিসেবে এই তিন প্রতিবেদন, প্রধান অভিযুক্তের জবানবন্দি ও পারিপার্শ্বিক আলামতের তথ্যের ভিত্তিতে আজ রোববার দেশব্যাপী আলোচিত এই মামলার অভিযোগপত্র জমা দিতে পারে পুলিশ।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এসব আলামতের ভিত্তিতে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন। ফরেনসিক রিপোর্টে হত্যার আগে শিশুটিকে ধর্ষণের প্রমাণ মিলেছে। এই মামলায় আপাতত ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হবে না বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। তাই এখনও ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার সমকালকে বলেন, ‘ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক ও ভিসেরা প্রতিবেদন পেয়েছি। তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। অপরাধ প্রমাণে আমাদের হাতে অনেক ধরনের আলামত ও তথ্য আছে। এ ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তি দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। ডিএনএ আলামত পরীক্ষার প্রয়োজন নেই।’
গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট সংগ্রহ করে পুলিশ। প্রতিবেদন পাওয়ার পর গতকাল রাতে অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করার কাজ চলছিল। আজ রোববার আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হতে পারে। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগপত্রে তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী, শিশুটির পরিবারের তিন সদস্যসহ মোট ১৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। স্বপ্নার বিরুদ্ধে লাশ গুমের চেষ্টা ও স্বামীকে পালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হচ্ছে।
এদিকে শিশুটিকে হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। গতকাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ হয়।
গত মঙ্গলবার পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির ওই ছাত্রীর লাশ উদ্ধার হয়। ঘটনার পর জানালার গ্রিল ভেঙে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা পালিয়ে যান। ঘটনাস্থল থেকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে এবং সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত বুধবার সোহেল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সোহেল ও স্বপ্না বর্তমানে কারাগারে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া সমকালকে জানান, আজ রোববার আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
ঈদের পরই বিচার শুরু
পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম ঈদের পরপরই শুরু হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। গতকাল শনিবার মহাখালীতে এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান।
শিশুটিকে হত্যা মামলার বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমনভাবে এই মামলার বিচার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শুরু করতে চাই, যাতে করে কোনো প্রশ্ন না থাকে। ঈদের ছুটির পরপরই আনুষ্ঠানিক মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘সাধারণ জনগণ এই বিচার শেষ করতে যতটা প্রত্যাশা করে, আমরা আশা করি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হবো।’
উচ্চ আদালতে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর অনুমোদনের জন্য মামলাটি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। তবে এ সময় পেপার বুক বা মামলার বৃত্তান্ত প্রস্তুত করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, যার কারণে চূড়ান্ত রায় পেতে বিলম্ব হয়।
হত্যাকারীকে দ্রুত সাজার আওতায় আনা হবে
পল্লবীর শিশুর হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, এই নৃশংস ঘটনায় গোটা জাতি স্তম্ভিত। দেশের প্রচলিত আইনের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অপরাধীকে সাজার আওতায় আনার জন্য সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এক অনুষ্ঠান শেষে মন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত যেসব শিশু-কিশোর অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের সবার প্রতি দেশবাসীর গভীর স্নেহ, মায়া ও মমতা রয়েছে। এসব বর্বরোচিত ঘটনার প্রতি জাতির চেতনা ও সমবেদনা ব্যক্ত করতে প্রধানমন্ত্রী নিজেই শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে গিয়ে হাজির হয়েছেন।
বিশেষ পিপি নিয়োগ
বিচার কার্যক্রম দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের লক্ষ্যে বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) হিসেবে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলুকে নিয়োগ দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। গতকাল মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
নিয়োগপ্রাপ্ত বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে এবং অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে চেষ্টা চালানো হবে।
বিভিন্ন সংগঠনের মানববন্ধন ও বিক্ষোভ
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পল্লবীর শিশুটির হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ-সমাবেশ অব্যাহত রয়েছে। শিশু হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে অবিলম্বে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠন নেতারা। গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) মানববন্ধন ও সমাবেশ থেকে সারাদেশে নারী-শিশু ধর্ষণ ও হত্যা, মাদ্রাসার ছাত্র ধর্ষণ, হত্যা, গুম ও মবের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানানো হয়। জাসদের সহসভাপতি শফি উদ্দিন মোল্লাহর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন নইমুল আহসান জুয়েল, ওবায়দুর রহমান চুন্নু প্রমুখ। সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর বিবৃতিতে বলা হয়, শিশুকন্যার ধর্ষণ ও খুনের বিচার নিশ্চিতসহ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতে সরকার ব্যর্থ হলে এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তিকে রাজনৈতিক চাপে কোণঠাসা করে রাখা হলে ধর্মান্ধ ফ্যাসিবাদী চক্রের আক্রমণ আরও বাড়বে। দেশের এই অস্থির সময়ে সব গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য জরুরি।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ঢাকা মহানগর শাখা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। সমাবেশে বক্তব্য দেন জুলফিকার আলী, আহসান হাবিব বুলবুল প্রমুখ।
একই দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে সম্মিলিত নাগরিক সমাজ। অ্যাসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিস ইন বাংলাদেশের (এডাব) বিবৃতিতে বলা হয়, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিচারের জন্য সর্বোচ্চ তিন মাস সময় নির্ধারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রাখতে হবে। একই ঘটনায় বিচারের দাবিতে চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন ইন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদ, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টও বিবৃতি দিয়েছে।
পল্লবীর শিশুটির হত্যাকারীর ফাঁসির দাবিতে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, মাগুরা, বাগেরহাট, বগুড়া শহরের সাতমাথায়, চট্টগ্রামে প্রেস ক্লাবের সামনে, মৌলভীবাজার শহরের চৌমোহনা চত্বরে ও নেত্রকোনার দুর্গাপুরে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ সমাবেশ এবং বিক্ষোভ সমাবেশ করে।
- বিষয় :
- শিশু হত্যা
- শিশু ধর্ষণ ও হত্যা
