জুলাই স্মৃতি জাদুঘর
প্রতীকী কবরের কাছে থমকে যায় পা
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:২৬ | আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই ৩৬ গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। মূল ভবনে ঢোকার আগেই দর্শনার্থীদের চোখে পড়ে একটি প্রতীকী কবরস্থান। সেখানে গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ছাত্র-জনতার স্মরণে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে। চারপাশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের নাম খোদাই করা ফলক। দর্শনার্থীরা এখানে থমকে দাঁড়ান।
গতকাল বৃহস্পতিবার সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার প্রথম দিনেই ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদের উত্তর কোণে অবস্থিত এই স্মৃতি জাদুঘরে ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়। কিন্তু ভিড়ের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি সময় দর্শনার্থীরা থমকে দাঁড়ান প্রবেশমুখের সেই প্রতীকী কবরের সামনে। কেউ শহীদদের নাম পড়ছিলেন, কেউ ছবি তুলছিলেন, আবার কেউ কোনো কথা না বলে কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যেন ভেতরে যাওয়ার আগে নিজেদের প্রস্তুত করে নিচ্ছিলেন একটি বেদনাবিধুর অথচ গৌরবময় ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানোর জন্য।
দর্শনার্থী আশিকুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘সময় গেলে বৃষ্টির জল শুকিয়ে যাবে, এই ফলকও আবার ঝকঝকে হবে। কিন্তু এখানে লেখা ইতিহাস, আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের স্মৃতি কখনও মুছে যাবে না। একটি জাতির সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ ইট-পাথর নয়, মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা স্মৃতি।’
প্রতীকী কবরের পাশেই গতকাল দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন জুলাই আন্দোলনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিহত সজল মিয়ার বাবা মো. হাসান। ছেলের নাম লেখা ফলকের দিকে তাকিয়ে বারবার চোখ মুছছিলেন তিনি।
মো. হাসান বলেন, ‘আমার ছেলে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিল। এখানে এসে ছেলের কথাই বারবার মনে পড়ছে। ভেবেছিলাম আন্দোলনের পর দেশ বদলে যাবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার অনেকটাই অপূর্ণ।’
সজল মিয়ার ছোট ভাই ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘ভাইয়ের ব্যবহৃত রক্তমাখা শার্ট-প্যান্টসহ স্মৃতিচিহ্ন এখানে রাখা হয়েছে। সেগুলো দেখতে এসেছি। মনে হচ্ছে, ভাই এখনও আমাদের মধ্যেই আছে।’
একসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত গণভবন এখন স্মৃতি জাদুঘর। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সরকার পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে উদ্বোধনের পরদিন গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় জাদুঘরটি।
জাদুঘরের নিচতলায় তুলে ধরা হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের নানা ঘটনা, গুম, খুন, নিপীড়ন, রাজনৈতিক দমনপীড়ন, লগি-বৈঠার হামলায় শহীদদের তালিকা, শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞ আওয়ামী বিচারব্যবস্থার ও স্কাইপে কেলেঙ্কারির তথ্য এবং বিভিন্ন আলোচিত ঘটনার দলিল, আলোকচিত্র ও তথ্যচিত্র। প্রবেশের শুরুতেই থ্রিডি প্রজেকশনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে ৫ আগস্টের পর গণভবনের বাস্তবচিত্র। রয়েছে আন্দোলনের দিনগুলোর শিল্পকর্ম, বিভিন্ন ঘটনার নথি ও ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা।
দ্বিতীয় তলায় স্থান পেয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন, পরিচয়পত্র, রক্তমাখা পোশাক, নারীদের অংশগ্রহণের দলিল, আন্দোলনের আলোকচিত্র, ভিডিওভিত্তিক থ্রিডি প্রদর্শনী এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ইনস্টলেশন। দেয়ালে দেয়ালে আন্দোলনের স্লোগান, আয়নাঘরের নির্যাতনের প্রতীকী ভাস্কর্য, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের ছবি। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ব্যবহৃত খাট ও চেয়ারও স্থান পেয়েছে জাদুঘরে।
জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে ঘুরে দেখা গেছে, ইতিহাস জানতে যেমন এসেছেন তরুণ-তরুণীরা, তেমনি সন্তান হারানো বাবা-মা, আহত আন্দোলনকারী, কিংবা দূরদূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষও নিজেদের স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন প্রদর্শিত প্রতিটি ছবি ও নিদর্শন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব গতকাল সমকালকে বলেন, এই জাদুঘর কেবল একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণাগার হয়ে উঠতে পারে। আর প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষ এখানে শুধু দেখতে আসছে না– অনুভব করতেও আসছে। সেই অনুভূতির শুরুটা হচ্ছে প্রবেশমুখে প্রতীকী কবরের সামনে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই।
গণভবন থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর
১৯৯৬ সালে নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা গণভবনে বসবাস শুরু করেন। তখন মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে গণভবন এক টাকার টোকেন মূল্যে শেখ হাসিনার নামে ইজারা দেওয়া হয়। ২০০১ সালে লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইজারা বাতিল করে। তখন শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে যাওয়ার পর কয়েক বছর সেটি আর ব্যবহৃত হতে দেখা যায়নি।
এর পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা প্রথমে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উঠেছিলেন। গণভবন সংস্কার শেষে ২০১০ সালের মার্চ মাসে শেখ হাসিনা সেখানে বসবাস করা শুরু করেন। শেখ হাসিনার শাসনামলের বেশির ভাগ কাজ গণভবন থেকে পরিচালিত হতো।
চব্বিশের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ এই বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। সেদিন জনতার ক্ষোভে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল বাসভবনের দেয়াল ও মেঝে। জাদুঘরে রূপান্তর করার সময় দেয়ালগুলোতে থাকা জনতার ক্ষোভের ভাষাকে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বিবেচনা করে একটি কক্ষ বাদে বাকি কক্ষগুলোর ফ্লোর থেকে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বাড়ির নিচতলায় প্রদর্শন করা হয়েছে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনের ইতিহাস। দোতলায় প্রদর্শিত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস।
- বিষয় :
- জুলাই স্মৃতি জাদুঘর