ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ ছাড়া নতুন ভবন নয়

নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ ছাড়া নতুন ভবন নয়
×

শরীফুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:৫৩

ঢাকা মহানগরীতে নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ ছাড়া কোনো নতুন ভবনের নকশা অনুমোদন পাবে না এখন থেকে। পাশাপাশি দুই কাঠার নিচের প্লটের ক্ষেত্রে জায়গা ছাড়ের পরিমাণ কমছে, আর বাড়ছে ২০ কাঠার ওপরের প্লটে। ১৪ কাঠার ওপরের প্লটে ১০ শতাংশ জায়গায় গাছ লাগানোর জন্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমন বিধান রেখে সংশোধন করা হচ্ছে ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা-২০০৮। ইতোমধ্যে সংশোধনীর খসড়া চূড়ান্ত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। শিগগিরই এটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঠানো হবে আইন মন্ত্রণালয়ে। পরে গেজেট জারি হবে। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

এ ব্যাপারে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদ উল্লাহ খন্দকার সমকালকে বলেন, 'নতুন বাড়ি নির্মাণে স্থবিরতা কাটাতেই বিধিমালাটি সংশোধন করা হচ্ছে। সংশোধনীতে ছোট ভবনের চারপাশের জায়গা ছাড়ার পরিমাণ কমানো হচ্ছে। তবে পরিবেশের কথা বিবেচনা করে বড় প্লটের জায়গা ছাড়ের পরিমাণ কমানো সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া আরও কিছু নতুন বিষয় যোগ হচ্ছে এ বিধিমালায়।'

সূত্র জানায়, সংশোধিত বিধিমালায় নতুন বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষ করে দুই কাঠা বা এর কম পরিমাণ জমিতে বাড়ি বা আবাসিক হোটেল নির্মাণে চারপাশের জমি ছাড়তে হবে ৩০ ভাগ। আর বাকি ৭০ ভাগে ভবন নির্মাণ করা যাবে। বিদ্যমান বিধিমালায় এই আকারের প্লটের ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণ করা যেত সাড়ে ৬৭ ভাগ জায়গায়। ছেড়ে দিতে  হতো ৩২ ভাগ জায়গা। এ ছাড়া ২০ কাঠার ওপরের প্লটে জায়গা ছাড়ের পরিমাণ পাঁচ ভাগ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে জায়গা ছাড়তে হবে ৫৫ ভাগ। আর ৪৫ ভাগের ওপর ভবন নির্মাণ করা যাবে। বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী এই আকারের প্লটে জায়গা ছাড়তে হয় ৫০ ভাগ। বাকি ৫০ ভাগের ওপর ভবন নির্মাণ করা যায়। অন্যান্য আকারের প্লটের ক্ষেত্রে জায়গা ছাড়ের পরিমাণ একই রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে স্থপতি অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আ স ম আমিনুর রহমান সমকালকে বলেন, 'ছোট আকারের প্লটের উচ্চতা বাড়ানো যায় না, এ জন্যই সংশোধিত বিধিমালায় জায়গা ছাড়ের পরিমাণ কমছে। আর বড় আকারের প্লটে উচ্চতার দিকে সুবিধা পায়, এ জন্য নিচের দিকে তাদের জায়গা বেশি ছাড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।'

নয়া বিধিমালা অনুযায়ী নতুন ভবন নির্মাণে নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা রাখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী ভবনের মালিককে নিজ খরচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত প্যানেলের জন্য নির্মিত কাঠামো সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত উচ্চতা অতিক্রম করতে পারবে না। নতুন ভবনের জন্য নিজস্ব আবর্জনা ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। ভবনের নকশায় আবর্জনা ব্যবস্থাপনা স্পেসের অবস্থান দেখাতে হবে। এটি না হলে ওই নকশা অনুমোদন পাবে না। এ ছাড়া বিধিমালায় ১৪ কাঠার ওপরের প্লটে গাছ লাগানোর কথা বলা হয়েছে। এই আকারের প্লটের ক্ষেত্রে ১০ ভাগ জায়গায় গাছ লাগাতে হবে। ভবনের মালিক নিজ খরচে গাছ লাগাবেন ও পরিচর্যা করবেন। সরকারের অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে এই গাছ কাটতে পারবেন ভবন মালিক। বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, দশ তলা উঁচু ভবনের ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুটি লিফট থাকতে হবে। এর মধ্যে একটি বেড লিফট থাকতে হবে। নতুন ভবনে বৃষ্টির পানি সংগ্রহে বিশেষ ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হয়েছে এ বিধিমালায়।

সূত্র জানায়, গত ২০০৮ সালে মহানগরীর বাড়িগুলোতে আলো-বাতাসের চলাচল ও পরিবেশ দূষণ রক্ষার্থে ভবনের চারপাশে জায়গা ছাড়ের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেয় সরকার। ওই সময় দুই কাঠা বা এর নিচের পরিমাণ জমিতে বাড়ি বা আবাসিক হোটেল নির্মাণে জমি ছাড়ের পরিমাণ সাড়ে ৩২ ভাগ। দুই কাঠা থেকে তিন কাঠা পর্যন্ত জমির ক্ষেত্রে ৩৫ ভাগ, তিন থেকে পাঁচ কাঠায় সাড়ে ৩৭ ভাগ এবং পাঁচ থেকে ১০ কাঠায় বাড়ি নির্মাণে ৪০ ভাগ, এ ছাড়া ৯ থেকে ১২ কাঠায় সাড়ে ৪২ ভাগ, ১২ থেকে ১৪ কাঠায় ৪৫ ভাগ, ১৪ থেকে ১৮ কাঠায় সাড়ে ৪৭ ভাগ এবং ১৮ কাঠার ওপর জমিতে ভবন নির্মাণে চারপাশের জায়গা ছাড়ার বিধান ৫০ ভাগ করা হয়। বিধিমালাটি প্রণয়নের পর নতুন বাড়ি নির্মাণে স্থবিরতা দেখা দেয়। বিশেষ করে দেড় থেকে পৌনে দু'কাঠার ছোট প্লটের মালিকদের শোচনীয় অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। ছোট আকারের প্লটের ক্ষেত্রেও ৩২ ভাগ জায়গা ছাড়ার নিয়ম রয়েছে। এসব বাড়ির মালিকের সংখ্যা এক লাখের বেশি। এ বিধান প্রণয়নের পর থেকেই হাত গুটিয়ে বসে আছেন এসব বাড়ির মালিক। তারা বিধিমালা পরিবর্তনের আর্তি জানান। এ বিষয়ে তারা এলাকার সংসদ সদস্য, গৃহায়ন মন্ত্রণালয় ও রাজউকে ধরনা দেন। এমন আবেদনের স্তূপ জমা পড়ছে রাজউকে। ১৯৯৬ সালে প্রণীত পুরোনো বিধিমালার আলোকে তারা বাড়ি নির্মাণ করতে আবেদন জানান সরকারের কাছে। এ বিধিমালায় দুই কাঠার নিচে প্লটে ভবন নির্মাণে জায়গা ছাড়তে হতো না। রাজউকও নতুন বিধিমালা ছাড়া বাড়ির নকশা অনুমোদন দিচ্ছে না। ফলে এসব মালিক নতুন ভবন তৈরি করছেন না। একইভাবে দুই কাঠার বেশি জমির মালিকরাও বিদ্যমান বিধিমালায় ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন। দেখা গেছে, অনেকেই আগের বিধিমালা অনুযায়ী নকশা অনুমোদন করছেন। আবার কেউ জমির চারপাশে বাড়তি জায়গা দেখিয়ে নকশা অনুমোদন করছেন। এভাবে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বিদ্যমান বিধিমালায়। এ জটিলতা কাটাতেই বিধিমালা সংশোধন করা হচ্ছে।

সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, দেড় কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত রাজধানী ঢাকায় অধিবাসীদের তুলনায় বসবাসের জন্য বাড়ির সংখ্যা কম। এ কারণে বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রেও চলছে নৈরাজ্য। যে যেভাবে পারছে সেভাবে বাড়ি ভাড়া নিচ্ছে। আর নতুন বাড়ি নির্মাণ না হলে কয়েক বছরের মধ্যে বাড়ি ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এসব দিক বিবেচনা করে গুরুত্ব রয়েছে ইমারত বিধিমালা সংশোধনের।

আরও পড়ুন

×