ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

দুর্গন্ধে চলা দায়

দুর্গন্ধে চলা দায়
×

সাজিদা ইসলাম পারুল

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:৩৬

দেড় বছর ধরে জল-সবুজে ঘেরা হাতিরঝিলে ফুল বিক্রি করে ৯ বছরের বর্ষা। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে বেগুনবাড়ীতে। প্রথম দিকে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকার ফুল বিক্রি করতে পারত। এখন কোনো রকম ৫শ' টাকার। বুধবার তাই পড়ন্ত বিকেলেও গোমড়া মুখে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে ছিল সে। হাতিরঝিলের পানির উৎকট গন্ধে মুখে কাপড় চেপে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, বিক্রি কম কেন? বর্ষা বলে, 'আগে এই দিকটায় (এফডিসি-হাতিরঝিল অংশে) মানুষ বেশি আসত। পানির পচা গন্ধে এই দিকে আর মানুষ আসে না। তাই বিক্রিও হয় না।' আরেক ফুল বিক্রেতা পারভীনও জানাল একই কথা। রাজধানীর মানুষের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র হাতিরঝিলের পানির উৎকট গন্ধে এলাকাবাসী ও দর্শনার্থীদের চলাফেরায় দুর্ভোগের পাশাপাশি লোকসান গুনতে হচ্ছে এখানকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদেরও।

পর্যাপ্ত পানি পরিশোধনের ব্যবস্থা না থাকায় হাতিরঝিলের পানির গুণগত মান খারাপ হতে হতে প্রকট আকার ধারণ করেছে। পয়ঃনিস্কাশনের ময়লা, আবর্জনা ও নোংরা পানি ঢুকে বিবর্ণ হয়ে গেছে সব পানি। বাতাসে উৎকট গন্ধ। পানির পচা গন্ধ মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে পড়েছে। আশপাশের মূল সড়কগুলোতেও এ দুর্গন্ধ। স্থানীয় লোকজন জানান, বর্ষার সময় ছাড়া বছরের প্রায় সব ঋতুতেই পানিতে গন্ধ থাকে। পর্যাপ্ত পানি পরিশোধনের ব্যবস্থা না থাকায় বর্তমানে শ্রমিক লাগিয়ে সরানো হচ্ছে ময়লাযুক্ত শেওলার আস্তরণ।

হাতিরঝিল উদ্বোধনের পর এটি বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। হাঁটাহাঁটি, ঘুরে বেড়ানোর জন্য রাজধানীর নানা প্রান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে এখানে। দিনে দিনে সবুজে ঘেরা প্রকল্পটি সবুজতর হলেও লেকের পানি মানুষের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাতিরঝিল প্রকল্পের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, আশপাশের বাসাবাড়ির গৃহস্থালি ময়লা-আবর্জনা, দর্শনার্থীর ফেলা বিভিন্ন খাবারের উচ্ছিষ্ট, চানাচুর ও চিপসের প্যাকেট, পানির বোতলসহ বিভিন্ন ধরনের ময়লা লেকের পানিতে ভাসছে। চারপাশে গড়ে ওঠা দোকান ও রেস্তোরাঁর ময়লাও ফেলা হচ্ছে পানিতে। কয়েকটি ড্রেন দিয়ে আশপাশ এলাকার পচা আবর্জনা ঝিলে প্রবেশ করে নষ্ট করছে পানির স্বচ্ছতা। এ পানি অনেক দিন আটকে থাকায় ক্রমেই রং হয়ে গেছে কালো। তবে ঝিলের

মগবাজার অংশে এই দুর্গন্ধ ভয়ানক আকার নিয়েছে। এই অংশে পানিতে ময়লা আর শেওলার পুরু আস্তরণ জমে কোথাও কালচে, কোথাও নীলচে, আবার কোথাও সবুজ রং ধারণ করেছে। বর্তমানে এই পানি জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।

মুগদার বাসিন্দা উম্মে কুলসুম চাকরি করেন ধানমন্ডির এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বাড়ি ফেরার পথে হাতিরঝিলের এফডিসি-বেগুনবাড়ির অংশে বিশ্রাম নেন। তিনি বলেন, 'এই এলাকা দিয়ে চলাচল করা খুবই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শীতকালে লেকের পানি থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে নানা রোগজীবাণু সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ঝিলে পানি আটকে থাকায় ক্রমেই পানির রং কালো হয়ে পড়ছে। আগে এখানে বসে বিকেলটা উপভোগ করতাম। এখন এর পাশ দিয়ে হাঁটাই মুশকিল!' এছাড়াও, হাতিরঝিলে সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিত ব্যায়াম করতে আসেন আশপাশের এলাকার অনেক মানুষ। তাদের মধ্যে একজন মগবাজারের বাসিন্দা লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, 'গুলশান লেক, কারওয়ানবাজার ও বেগুনবাড়ী দিয়ে হাতিরঝিলের পানিতে প্রতিনিয়ত ঢুকছে ময়লা পানি। দূষিত পানির ওপর দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করছে ওয়াটার ট্যাক্সি। এ থেকে সৃষ্ট ঢেউয়ের কারণে আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় সকাল-সন্ধ্যার আর তেমন আসা হয় না। অথচ আগে প্রতিদিনই ব্যায়াম করতে আসতাম।'

ঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সির অ্যাডমিন অফিসার রুবেল হোসাইন জানান, প্রতিবছর শীতকালে যখন পানি কমে যায় তখন দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এই দুর্গন্ধ আরও প্রকট আকার ধারণ করে। অনেক যাত্রী দুর্গন্ধের কারণে ওয়াটার ট্যাক্সিতে উঠতে চায় না। এই সমস্যা সমাধানে আমরা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতেও দেখি না। তবে ইদানীং শ্রমিকরা ঝিলের ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত পরিস্কার করে। তাতে কোনো লাভ হচ্ছে না। দিনে দিন দুর্গন্ধ আরও বাড়ছে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু নাসের খান বলেন, 'ঝিলের পানির দুর্গন্ধে টেকা মুশকিল। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে আশপাশের বাসিন্দাসহ পথচারীরা। এই দুর্গন্ধ পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি। অবিলম্বে এর বর্জ্য অপসারণ করে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।' সেন্টার ফর ল' অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, 'হাতিরঝিল প্রকল্পের মূল পরিকল্পনায় পানি শোধনের আধুনিক ব্যবস্থার কথা বলা থাকলেও কার্যত তা দেখা যাচ্ছে না। আশপাশের ময়লা ও নোংরা পানি এখানে প্রবেশের কথা ছিল না। অথচ প্রতিনিয়ত নোংরা পানি হাতিরঝিলের পানিতে মিশছে।'

তবে সংশ্নিষ্টরা বলছেন এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পানি থেকে ময়লা সরানোর কাজও চলছে। এ বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান প্রকৌশলী এবং হাতিরঝিলের সমন্বিত প্রকল্প পরিচালক এ এস এম রায়হানুল ফেরদৌস বলেন, 'ময়লা সরানোর কাজ ইতোমধ্যে শুরু করেছি। পুরো কাজ শেষ হতে আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত লেগে যাবে।'

আরও পড়ুন

×