ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

করোনায় থেমেছে সব ব্যস্ততা

করোনায় থেমেছে সব ব্যস্ততা
×

মাসুম আহমেদ পাটওয়ারি

প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২০ | ০৬:৫৮

প্রবাস জীবনে আছি আছি সেই ২০০৪ সাল থেকে। মাঝে কিছু সময়ের জন্য দেশে ছিলাম। তারপর আবার প্রবাস জীবন। ইংল্যান্ড এ থাকার সময়ে যখন কোন কারনে লন্ডন এ যেতাম, দেখতে পেতাম যে মানুষ কিভাবে ছুটে চলছে। বিশেষ করে টিউব ষ্টেশন গুলিতে গেলে এই ছুটে চলা আরও বেশী দেখা যেতো। যেন এক সেকেন্ডের জন্যও মানুষের অবসর নেই। শুধু একবার দেখেছিলাম অল্প কিছু সময়ের জণ্যে থেমে যেতে। তা ছিল লন্ডনে একই সময়ে ছয়টি স্থানে বোমা বিস্ফোরণের সময়ে। এরপরে আবার সেই অবিরাম ছুটে চলা।

ক্যালিফোর্নিয়া তে আছি পাঁচ বছরের বেশী সময় ধরে। এখানেও দেখি মানুষ শুধু ছুটেই চলে। আমি নিজেও তাই ছুটছি। শুধুমাত্র রাতে একান্তই ঘুমাতে হয় বলে কিছু সময়ের জন্যে থেমে যাই। নতুবা সেই যে ছুটে চলা, যেন থামছেই না। কিন্তু গত কিছুদিন থেকে যেন হঠাত করেই পালটে গেলো জীবনের এই ছুটে চলা। যেন জীবন থমকে যাচ্ছে। নাকি প্রকৃতি আমাদের কে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে কিছু থামতে হয়। থামো সবাই।

করোনার আক্রমন যখন চায়নাতে শুরু হয় তখন আমরা বিভিন্ন আড্ডায় এ নিয়ে কথা বলতাম। অনেকে এটাও বলেছি যে, আসলে ওরা এতো কিছু খায় যে কোন প্রাণীর শরীর থেকে এসেছে কিভাবে জানবে? কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই চিত্র পালটে গেলো। চায়না থেকে চলে গেলো অন্য দেশ গুলিতেও। আমার বন্ধু টুটুল থাকে ইতালি তে। সেখানকার অবস্থা এখন ভয়াবহ। আর বর্তমানে এই ভাইরাসের আক্রমন ছড়িয়ে গেছে সাড়া বিশ্বে।

মাসের প্রথম দিকে সবসময়েই একটা বড় বাজার করে রেখে দেই। এই মাসের প্রথম দিকেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। কিন্তু যেহেতু চারিদিকে বিভিন্ন কথা শুনছিলাম তাই এ মাসের বাজারের সাথে কিছুটা বেশী বাজার করলাম। কিন্তু অবস্থা ধীরে ধীরে কেমন যেন পালটে যেতে লাগলো। সবার মধ্যে কেমন যেন একটা অজানা অস্থিরতা। এর মধ্যেই শুনতে পাই যে আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এই ভাইরাস আক্রমন করেছে। এবং ক্যালিফোর্নিয়াতেও চলে এসেছে। আশে পাশের বেশ কিছু শহরে ধরা পড়লো। বেশ কিছু শহরের স্কুল কলেজ বিভিন্ন অফিস বন্ধ হয়ে গেলো। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর ইমারজেন্সি ঘোষণা করলেন। রাতারাতি চিত্র একেবারেই পালটে গেলো।দোকানে গেলাম। নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। এতো মানুষ কোথা থেকে এলো? মনে হল যেন শহরের সব মানুষ এক সাথে রাস্তায় বের হয়ে এসেছে। বিভিন্ন দোকানের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মুহুর্তেই শেষ হয়ে গেলো। বিশেষ করে জীবাণু নাশক দ্রব্যাদি, টয়লেট্রিজ। একদিন পরেই শহরের ঘোষণা এলো যে স্কুল কলেজ সব বন্ধ আপাতত আগামি এক মাস। এবার শুরু হল বড় বড় সুপারশপ গুলি থেকে খাদ্য দ্রব্যাদি শেষ হয়ে যাওয়া। কারন সবাই বুঝে গেলো, যে কোন মুহুর্তে হয়তো ঘোষণা আসবে ঘর থেকে আর বাইরে বের হওয়া যাবে না।

ক্রেতার এই অবস্থা দেখে প্রায় প্রত্যেক দোকানেই কিছু নিয়ম করলো। এক সাথে যেন সবাই না ঢুকে। লাইন করে দেয়া হল। যেন মানুষ বেশী একটা জমায়েত হতে না পারে। নোটিশ ঝুলিয়ে দেয়া হল কেউ যেন দ্রব্যাদি অতিরিক্ত না কিনে। যেন সবাই সমান হাড়ে পেতে পারে। বয়স্ক যারা হয়তো বিভিন্ন জিনিষ খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়তে পারে, তাঁদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হল। কোন দোকানেই কোন পন্যের মূল্য বৃদ্ধি হয়নি। বরং কিছু কিছু দোকানের সামনে অনেক বড় বিশাল ব্যানার ঝুলিয়ে দেয়া হল যে, ক্রেতাদের এই জরুরী অবস্থার কথা চিন্তা করে দাম কমিয়ে দেয়া হল। একটু এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলাম কেন এটা করেছো? দোকানের একজন স্টাফ উত্তর দিলো, এই জরুরী মুহুর্তে অনেকের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ নাও থাকতে পারে। আমার মনে পড়ে গেলো, এই অবস্থায় যে দেশ কে আমি ছেড়ে এসেছি অথচ এখনো মনে প্রানে ধারন করি, সেই দেশের দোকানের মালিকরা কি করবেন? দেশে থেকে খবর পাই সব জিনিষের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাচ্চাদের স্কুল থেকে ইমেল এলো, সেলফোনে টেক্সট এলো, প্রত্যেক বাচ্চার জন্য সকালের ব্রেকফাস্ট এবং দুপুরের লাঞ্চ দেয়া হবে প্রতিদিন। যতদিন এই অবস্থা থাকবে। যদিও স্কুল বন্ধ। তা ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থা বা বিত্তশালীরা এগিয়ে এসেছে। সবাই সবাই কে সাহায্য করছে। এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, সবাই জানে এবং মানছে, নিরাপদ থাকতে হবে সবাই কে। কারন যদি কেউ একা নিরাপদ থাকে সব সাবান আর পরিস্কার হবার জিনিষ পত্র কিনে, তাহলে অন্যদের কি হবে। তাই সবাই সবাইকে সাহায্য করছে। কারন কেউ যদি একা নিরাপদ থাকলো, কিন্তু পাশের জন নিরাপদ না, তাঁর মানে দাঁড়ায় আমি আমার পাশেই ঝুঁকি নিয়ে অবস্থান করে হুমকির মধ্যে বসবাস করছি। তাঁর মানে যে কোন সময়ে আমি আক্রান্ত হব। এই বোধ টুকু সবার মধ্যেই আছে।

বিভিন্ন অফিস তাদের এমপল্গয়ীদের কে সুযোগ করে দিলো বাসা থেকে কাজ করার। আমার মত যারা সেবামূলক কাজ এর সাথে জড়িত জনগনের দৈনন্দিন জীবন সহজ করা জন্যে, তারা এখনো কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদেরকেও যে কোন সময়ে বলে দিবে হয়তো যে বাসা থেকে কাজ কর। আজকে কাজ থেকে তাই শুনে এলাম।

শহরে এখন তেমন একটা মানুষজন দেখা যায় না। যে যার মত করে নিজেকে পৃথক করে নিয়েছে। আগে পার্ক গুলিতে বাচ্চাদের দেখা যেতো। এখন খালি। মনে হয় যেন কোথাও কেউ নেই। একটা নির্দিস্ট অবস্থায় না এলে হয়তো এই ভাবে চলতে থাকবে। ছুটে চলা জীবন কিছুদিনের জন্য হলেও থমকে আছে। ঠিক থেমে না থাকলেও দ্রুততার মাঝে স্থবিরতা এসেছে। আমি যেহেতু এই অঙ্গরাজ্যের উন্মুক্ত সড়ক, মহা সড়ক এর পরিবেশ পররিকল্পনা নিয়ে কাজ করি, তাই আমাকে বিভিন্ন সময়েই ঐ সমস্ত দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা সড়ক গুলিতে যেতে হয়। মাঝেমাঝে সড়কের পাশে দাঁড়াতে হয়। তখন দেখতে পাই কিভাবে ছুটে চলছে সবাই। অথচ এখন? তেমন কোন যানবাহন সড়কে নেই। প্রয়োজন ছাড়া কাউকে দেখা যায় না। দুরন্ত গতিতে ছুটে চলে শুধুই জরুরী বিভাগের যানবাহন যেমন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস আর এ্যাম্বুলেন্স। আর আমরা সবাই যে যার মত থেমে আছি। আসলে কিভাবে থেমে যেতে হয় আমরা তা ভুলে গিয়েছিলাম। তাই প্রকৃতি হয়তো আমাদের কে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে থাম। সবাই থাম। অনেক হয়েছে। সবাই মিলে কিছুদিন বিশ্রাম নাও।

বিশ্রাম এর জন্য যদি হয় তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু এর মধ্যে যে হাড়ে এই সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে যদি সেই কারনে থেমে যেতে হয় তাও না হয় ঠিক আছে। কিন্তু এই সংক্রামক ব্যাধি যদি তার আক্রমনের দ্বারা থেমে যাবার পরেও আঘাত করতেই থাকে তাহলে তা হবে মানব সভ্যতার জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়। এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবার এখন পর্যন্ত উপায় হল থেমে যাওয়া। থেমে যাওয়া মানে হল যে যার মত নিরাপদ থাকা। কিছুদিনের জন্য দূরত্ব বজার রাখা। আজকে আপনি দূরত্ব বজায় রাখুন, থেমে যান, তাহলে কিছুদিন পড়ে আরও নিবিড় ভাবে কাছে যেতে পারবেন। আরও বেশী করে ছুটে চলতে পারবেন। এই পরিস্থিতিতে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়া মানে আপনি দূরে সরে যাননি। বরং ভবিষ্যতে আরও বেশী করে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আপনি শক্তি সঞ্চয় করছেন।

আসুন সবাই সবার নিরাপত্তার জন্য কিছুদিনের জন্য দূরে সরে যাই। থেমে যাই। হয়তো আমাদের এই থেমে যাওয়া, শক্তি যোগাবে সামনের দিন গুলিতে আরও বেশী করে ছুটে চলার জন্যে। আরও বেশী করে সম্পর্কের টানে কাছে যাবার জন্যে। নিরাপদ সম্পর্কের জন্য।

ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন

×