করোনায় বসবাস, হাত ধুই বারমাস
মু. মাহফুজ উর রহমান
মু. মাহফুজ উর রহমান
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২০ | ০৭:০৮ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২০ | ১১:০৪
বিশ্বব্যাপী প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক চেহারায় আবির্ভূত করোনাভাইরাস একটি রূঢ় বাস্তবতা সবার সামনে তুলে ধরেছে। স্বাস্থ্যবিধির প্রসারে যারা কাজ করেন, এ আতঙ্কময় পরিস্থিতির মাঝেও তারা এখন কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন। এতদিন ধরে তারা যা বলার চেষ্টা করেছেন, এখন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাসহ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ, চিকিৎসক, কিংবা গণমাধ্যম -সবখানেই সবাই মিলে তা বলছেন।
সারা বিশ্বে এক আতঙ্কময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্কের চাইতে সচেতনতাই এখন করোনা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়। আগাম সতর্কতা হিসেবে তারা বলছেন, বারবার হাত ধোয়ার কথা! বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ তাদের এই সতর্কতামূলক বার্তাগুলো দেখছেন, পালন করার চেষ্টা করছেন এবং দেদারসে শেয়ারও করছেন! আমাদের দেশেও হাত ধোয়ার ব্যাপারে এতদিন যারা উদাসীন ছিলেন, তারাও এখন হাত ধুচ্ছেন, অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা আরও উচ্চমূল্যের জীবাণুনাশক ব্যবহার করছেন! বাজারে হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ হাত ধোয়ার লিকুইড সাবান বা মাস্কের দাম বেড়ে গেছে, তবে বেড়েছে চাহিদা এবং সরবরাহ দুটোই। এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন বলেই বিশ্বাস করতে মন চাইছে!
এদেশ ১৭ কোটি মানুষের দেশ। জনগণের অধিকাংশের মাঝেইস্বাস্থ্য সচেতনতার বড়ই অভাব। তাছাড়া এ ধরনের মহামারির মত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের দেশে চিকিৎসার উপযুক্ত অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। নেই প্রশিক্ষিত ও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনী বা তাদের সুরক্ষা দেবে এমন ধরনের উপকরণ বা পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইক্যুইপমেন্টস)। তাই করোনাকে সামনে রেখে সরকারসহ আমাদের সকলের প্রস্তুতি যদি তেমন লাগসই বা সমন্বিত না হয়, তাহলে এটা মোকাবিলা করাই বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের এ সীমিত সম্পদ, জনবল ও অভিজ্ঞতা দিয়েই এখনসবাই মিলে কিভাবে করোনাকে মোকাবিলা করা যায়, সেটাই ভেবে বের করতে হবে।
প্রযুক্তির এ যুগে এখানে আরও বড় একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে তথ্যের ভিত্তিহীন প্রচার, যা আতঙ্ককে উসকে দিচ্ছে। সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো আরও এক ধাপ এগিয়ে। এখানে নিত্যদিন নিত্যনতুন পোষ্ট ভাইরাল হয়, যা দেখেই মানুষ হুমড়ি খেয়ে থানকুনি পাতা কিংবা আদা-রশুনকে করোনার প্রতিষেধক হিসাবে ব্যবহার করা শুরু করেছেন, যদিও করোনা মোকাবিলায় এসব তথ্যের কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই। ভাইরালের প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণকারীরাও এদের সাথে পেরে উঠছেন না। তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে সরকারের অকারণ সময় ক্ষেপণ জনগণের মাঝে অনেক ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করছে, যার সুযোগে জন্ম নিচ্ছে গুজব আর প্রোপাগান্ডা।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, করোনার ব্যাপক সংক্রামণের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সরকার প্রবাসীদের ঢালাও ও ঢিলেঢোলাভাবে দেশে ঢুকতে দেয়াতেই পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। বিদেশফেরতরা সরকারের হোম কোয়ারেন্টাইনের নির্দেশনা মানছেন না, সকলের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছেন। বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছেন, পিকনিক করছেন ইত্যাদি। নির্দেশনা মানছেন না রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধিরাও। তারাও লটবহর নিয়ে জনসংযোগ করছেন, ক্যামেরার সামনে জনগণকে মাস্ক পরিয়ে দিচ্ছেন, গণহারে হাতধোয়া প্রদর্শন করছেন ইত্যাদি। শোনা যায় কতিপয় সরকারি শীর্ষকর্মকর্তারাও সম্প্রতি দেশে এসে হোম কোরেন্টাইনে না থেকে স্বাভাবিক দাপ্তরিক কাজ করেছেন, যা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের গুরুত্বপূর্ণ কর্তা-ব্যক্তিরা টিভি-মিডিয়ার টকশোতে এসে বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকম বক্তব্য দিচ্ছেন, যা মানুষকে দ্বিধায় ফেলে দেয়। আসলে আমরা জাতি হিসাবে হয়ত এমনই! সময় বুঝি না, আগ্রাধিকার বুঝি না। বুঝি না কখন কোন কথাটি বলতে হবে, কোন কাজটি করতে হবে!
বিশ্বব্যাপী করোনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সত্য, কিন্তু এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বা থামিয়ে দিয়ে বেশ কিছু ইতিবাচক উদাহারণ ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে। চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, বা সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশই সেটা করে দেখিয়েছে। তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশের সরকারকেও এখন দ্রুত এবং জোরালো পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, সময় শেষ হয়ে আসার আগেই।
সরকারের কাজ সরকার করছে এবং করবেও। এখন আমাদের কাজ আমরা ঠিকমত করতে পারলেই সেটা সরকার ও দেশের জনগণ সকলের জন্যই মঙ্গলজনক হবে।
প্রশ্ন হতে পারে আমাদের কাজ তাহলে কী? সহজ উত্তর হল, সচেতনতার সাথে স্বাস্থ্যবিধি ও অন্যান্য স্বাস্থ্য নির্দেশনাগুলো মেনে চলা এবং সে অনুসারেই নিজের জীবনাচারণকে ঢেলে সাজানো। স্বাস্থ্যনির্দেশনায় বলা হচ্ছে্ সংক্রমণের ঝুঁকিএড়াতে সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে, মানে ঘরের মধ্যে থাকতে এবং অসুস্থ বা অন্যদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে। যে কোন ধরনের জনসমাগম এবং গণপরিবহণ পরিহার করতে। বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার করতে। হাঁচি-কাশির সময় রুমাল বা টিসু ব্যবহার করতে এবং ব্যবহারের পর সেগুলো ঢাকনাযুক্ত বিনে বা প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়িয়ে নিরাপদ পদ্ধতিতে অপসারণ করতে । হাত পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত না করে নিজের মুখ, কান, নাক বা চোখ স্পর্শ না করতে। অন্যের সাথে করমর্দন বা কোলাকুলি না করতে, যেন আক্রান্ত কারো কাছ থেকে এ ভাইরাস আপনাকেও আক্রান্ত করতে না পারে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমরা যদি অপ্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বের না হই এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার মূল বিষয়গুলো মেনে চলি, যেমন বারে বারে (অন্তত ১/২ ঘণ্টা অন্তর, ন্যূনতম ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে) দুই হাত কবজি পর্যন্ত সাবান- পানি দিয়ে ভালমত ধুয়ে ফেলি, তাহলে করোনা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
দীর্ঘদিন বাংলাদেশে ওয়াস তথা স্বাস্থ্যবিধির উন্নয়নে কাজ করছে এমন একটি বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতায় এদেশে স্বাস্থ্যবিধি চর্চার সার্বিক অগ্রগতি আমাকে হতাশ করে। এমনকি গত বেশ কয়েক বছরে হাত ধোয়ার ক্ষেত্রেযে সাফল্য এসেছে তাতেও খুব আশাবাদি হবার সুযোগ নেই! প্রতিষ্ঠানিকভাবে এমন আত্মসমালোচনা করতে দ্বিধা নেই যে, হাত ধোয়া নিয়ে জনসাধারণের জ্ঞান যতটা বেড়েছে, সেই তুলনায় চর্চা অনেক কম। অর্থাৎ, অনেক মানুষ জানেন, হাত কেন ধুতে হবে বা কিভাবে ধুতে হবে, কিন্তু বাস্তবে তিনি সেটা পালন করছেন না! ২০১৯ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত এক জরিপে এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৫%। আর ভয়টা সেখানেই! বিষয়টি তাহলে এতটাই গুরুত্বহীন! সমস্যাটা আসলে কোথায়?
হাত ধোয়ার প্রসারে কোন ধরনের যোগাযোগ কার্যকর তা নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন গবেষণা রয়েছে। কোন ভঙ্গিমায় বার্তা দিলে মানুষ সহজে বুঝবে এবং গ্রহণ করবে তারজন্য হরেক রকম তরিকাও প্রয়োগ করা হয়েছে। বার্তা একবার বললেই কি যথেষ্ট হবে, নাকি একাধিক বার একই বার্তা দিয়ে যেতে হবে, যেন সে গুরুত্ব দেয়। মাধ্যম হিসেবে কোনটি শ্রোতার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হবে, তার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ। যেমন ছবির বই, ফ্ল্যাশকার্ড, কবিতা, নাটক,পট, কার্টুন, পুতুল নাচ বা লোকগীতি, কি নয়! ভিডিও প্রদর্শনীর মাধ্যমে, কেবল টিভির চ্যানেলে, টিভির টকশোতে, উঠোন বৈঠকে, চায়ের দোকানে, হাট বাজারে, কোথায় আলোচনা হয়নি! মানুষকে লজ্জা দিয়ে বলতে পারলে তবে কি সে তা শুনবে, নাকি ভয় দিয়ে, ঘৃণা দিয়ে বলতে পারলে আসল কাজটি হবে? স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য ব্যক্তির নিজের পরিবর্তনটাই জরুরি, নাকি তার পুরো পারিপার্শ্বিক পরিবেশটারই পরিবর্তন আগে দরকার,এমন হাজারো প্রশ্ন মাথায় নিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়েছে।একেবারে এ থেকে জেড, কত সুদীর্ঘ এবং বিস্তৃত যেন এর পরিধি।
হাত ধোয়ার প্রসারে সরকারি, বেসরকারি ও কর্পোরেটদের আগ্রহ বা বিনিয়োগ কিন্তু মোটেও কম নয়! কিন্তু এরা কেউই সেভাবে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি চর্চায় পুরোপুরি নিয়ে আসতে পারেনি, যেমনটি করোনায় পেরেছে। আসলে মানুষ তার নিজের জীবনকে অনেক ভালবাসে।
এখন অনেক অফিস, দোকান বা বাসা বাড়ির প্রবেশ মুখেই আপনি পেয়ে যাবেন কোন না কোন ধরনের জীবাণুনাশক। মানে জীবাণুমুক্ত না হয়ে যেন কারুরই ভিতরে ধোকার উপায়টি নেই। পরিচিত এক হার্ডওয়ার ব্যবসায়ী বললেন, তিনি এখন থেকে তার দোকানে ঢোকার মুখেই হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখবেন, ক্রেতা সকলকে জীবাণুমুক্ত হয়েই তবে তার দোকানে ঢুকতে হবে।
আলাপকালে এক মুদি দোকানী জানালো ইদানিং সেও তার দোকানে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখছে। তাকে প্রশ্ন করলাম, স্যানিটাইজারের তো অনেক দাম, মানুষ এগুলো কেনে? সে জানালো, এখন করোনার ভয়ে সবাই হ্যান্ড স্যানিটাইজার বেশিবেশি করে কিনছে, লিকুইড সাবানও কেনে, তবে কম। আমি বললাম, কেন সাবানে করোনা যায় না? সে বলল, “যায়, তবে স্যানিটাইজারের শক্তি বেশি”।
আমার ধারণা এ সমাজে তার মত অনেকেই এমনটি বিশ্বাস করেন, যেটি ভেঙ্গে দেয়া দরকার। আমি তাকে বললাম, কে বলেছে সাবানের চেয়ে স্যানিটাইজারের শক্তি বেশি? সাবান আরও ভাল জীবাণু ধ্বংস করতে পারে। আর সেটা যে কোন দামের বা ব্যান্ডের সাবান হলেই হবে। এমনকি কাপড় কাচার সাবান হলেও চলবে। শুধু ২০ সেকেন্ড ধরে ফেনা তুলে হাত ধুতে পারলেই জীবাণূ ধ্বংস হবে। কথা শুনে সে আমার দিকে হা করে চেয়ে রইলো!
এই কঠিন সময়েও আমরা আশাবাদী হতে চাই। বিশ্বাস করতেচাই করোনা আতঙ্ক দিয়ে মানুষের মাঝে হাত ধোয়ার যেই তিবাচক সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, তা অব্যহত থাকবে। করোনাকে আমরা অবশ্যই পরাজিত করব, কিন্তু হাত ধোয়া বন্ধ করবো না। আসুন আমরা সতর্ক থাকি, সঠিক নিয়ম মেনে হাত ধুই এবং নিরাপদে থাকি!
লেখক: প্রজেক্ট ম্যানেজার-ওয়াটারএইড বাংলাদেশ
- বিষয় :
- চতুরঙ্গ
- করোনা
- করোনাভাইরাস
- ওয়াটারএইড
