ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

সামাজিক দূরত্ব বনাম ক্ষুধার নৈকট্য

সামাজিক দূরত্ব বনাম ক্ষুধার নৈকট্য
×

মো. মাহান উল হক- সমকাল

মো. মাহান উল হক

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২০ | ০৩:৪৮ | আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২০ | ০৫:৩৬

এখন প্রতিটা ভোর শুরু হচ্ছে আক্রান্ত আর মৃত্যু সংখ্যা গোনার মধ্যে দিয়ে। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে আশঙ্কা কিংবা আকাঙ্খা। আশঙ্কা একদিকে যেমন আছে মৃত্যুর কিংবা বেঁচে থাকলেও কিভাবে বেঁচে থাকা যাবে, এই চিন্তার। অন্যদিকে তীব্র আকাঙ্খা আছে বেঁচে থাকার, আশেপাশের প্রিয়জনদের মৃত্যু না দেখার। পৃথিবীর একেক দেশ একেকভাবে করোনাভাইরাস মোকাবেলা করছে। তবে যেহেতু এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোন কার্যকর ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হয়নি, তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ তাবৎ বিশ্বের গবেষক, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মূলত প্রতিরোধকেই এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া রোধে কার্যকর উপায় বলে মনে করছেন। এ জন্য সবাইকে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্য সতর্কতা মেনে চলা এবং এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে নিজেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন।  আর এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সবাইকে এই সময়ে সুষম খাদ্য বিশেষ করে, দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশের কতজনের জন্য ‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’ বাড়াতে ‘ভালো-মন্দ’ খাওয়ার ব্যবস্থা আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি?  

সামাজিক দূরত্ব ও ঘরে থাকা নিশ্চিত করার জন্য গত মাসের ২৬ তারিখ থেকে দেশে সরকারি বেসরকারি অফিস আদালতে ‘সরকারি ছুটি’ ঘোষণা করেছে সরকার।  গণপরিবহন, খাবার আর ওষুধ ছাড়া অন্য দোকানপাট ও ব্যবসা বাণিজ্যও বন্ধ। শুরুতে 'লকডাউন' নাম না দিলেও পরবর্তী সময়ে রোগীর সংখ্যা বিচারে ঝুঁকির বিচারে দেশের বেশিরভাগ জেলাই এখন সরকারিভাবে ‘লকডাউন’ এর আওতায়। সরকারের প্রচেষ্টা কিংবা জনগণের সামাজিক দুরত্ব মানা না মানার নানান খবরের মধ্যে দিয়েই চলে গেছে একমাস। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে গিয়ে এই লম্বা শব্দে শহরে কিংবা গ্রামে কাজ হারিয়েছে হাজারো খেটে খাওয়া মানুষ। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তাদের খাবার কেনার সামর্থ্যে তথা পুষ্টির তালিকায় তথা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থাপত্রে।   

করোনার কারণে মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর প্রভাব ও টিকে থাকার কৌশল নিয়ে পিপিআরসি ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) যৌথ জরিপ পরিচালনা করেছে। এ জরিপে ১৬ এপ্রিলে প্রকাশিত ফল থেকে জানা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে শহরের দরিদ্র মানুষের আয় প্রায় ৮২ শতাংশ আর গ্রামের দরিদ্র মানুষের আয় প্রায় ৭৯ শতাংশ কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে মানুষ টিকে থাকার জন্য খাবারের জন্য ব্যয় কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে, কারণ বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষ যা আয় করে তার বেশিরভাগই খাবার কেনার টাকা জোগাতে শেষ হয়ে যায়। করোনার এই পরিস্থিতিতে শহরের মানুষ এমনিতে যা খায় তার প্রায় অর্ধেক খাচ্ছে। আর গ্রামের মানুষ কম খাচ্ছে তিন ভাগের এক ভাগ।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকটে অনেক মানুষ এর মধ্যেই নতুন করে দরিদ্রসীমার নিচে নেমে গেছে, যাদের ‘নতুন দরিদ্র’ বলা হচ্ছে এবং তারাও এখন তিন ভাগের একভাগ কম খাচ্ছে । এই কম খেয়ে বেঁচে থাকাটা এসব মানুষের পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর মারাত্বক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে পুষ্টির পরিমাণ কমেছে ২৩ শতাংশ, যা গ্রামে ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ একে তো মানুষকে তিনবেলার জায়গায় দুইবেলা-একবেলা খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে অন্যদিকে যেটুকুও খেতে পারছে সেখানে পুষ্টিকর খাবার রাখতে পারছেনা।  বাস্তবতা হল ‘ভালো- মন্দ’ খেয়ে এই মুহূর্তে ‘রোগ প্রতিরোধ’ ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থাপত্র দেশের বেশিরভাগ মানুষের জন্য খাটছে না। 

সরকারি ছুটি কিংবা লকডাউন আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের হাতে এই মুহূর্তে খাবার কিংবা নগদ টাকা পৌঁছান জরুরি; যাতে করে সবাই বেঁচে থাকার পাশাপাশি কিছুটা হলেও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারে। সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে মানুষের অর্থনৈতিক ও খাদ্য সংকটের পাশাপাশি মানুষের আস্থার সংকটও দূর করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। ‘সামাজিক দূরত্ব’ নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা যেন ‘মানবিক সংকট’ তৈরি না করে ফেলি।    

আরও পড়ুন

×