ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

করোনাকালে কর্ণফুলী

করোনাকালে কর্ণফুলী
×

ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলি

ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলি

প্রকাশ: ১০ মে ২০২০ | ০৪:২২ | আপডেট: ১০ মে ২০২০ | ০৫:১৪

করোনাকালের পরিবেশ-প্রতিবেশ অনেকটাই স্বচ্ছ। নির্মল জলের মৃদুমন্দ ছন্দায়িত স্রোতের সাগর পানে বয়ে চলা নদী। দুই পাড়ে যার কয়েকশ' শিল্পের স্বরব, নির্মমতা। অযাচিত, অনাকাঙ্ক্ষিত, অবাঞ্চিত দূষিত তরল এবং কঠিন বর্জ্যকে অনিচ্ছায় বয়ে নিয়ে যাওয়া নদী কর্ণফুলী। একটু বিরতি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে প্রতিদিন সাগরকে আচমকা পরিচ্ছন্ন পানি নজরানা দিচ্ছে করোনার এই বিশ্ববিপর্যয় কালে। এ যেন মধুর নৃত্যে নিখিল চিত্ত বিকাশে অফুরন্ত অনুভূতি।

জঞ্জাল ধূসরিত মাটি বাতাসের নিষ্ঠুর পৃথিবী যেন সহসাই নির্মল সুকান্ত সূর্যের সুস্মিতা। সু বদনে সুবচন। নির্মল নরম সবুজের উচ্ছ্বসিত সেঁজুতি। নীল আকাশের সাথে বহুদিনের চেনা জানা, অনেকটাই ধুলোবালিমুক্ত, মৃদুমন্দ বাতাসের এমন নির্মল পরিবেশ। এমন চরাচর, সহসা ধরাতল। বাতাসে অবাঞ্চিত বহুমাত্রিক গ্যাসের অযাচিত বাড়াবাড়ি নেই। নেই জীবনঘাতি রসায়ন। সবুজে কলুষিত জঞ্জাল-কঙ্কাল নেই। নির্মল নীল আকাশের সাথে যেন মাটির পৃথিবীর স্বচ্ছ সবুজের বহুদিনের, বহুযুগের অনাকাঙ্ক্ষিত, অতৃপ্তির দেখাদেখি।

সবুজ পাহাড়ের কঠিন বুক চিরে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি নদী কর্ণফুলী। গানের নদী, প্রাণের নদী, আদিবাসী নৃজনগোষ্ঠীর নদী, বহুজাতিক, বহুধর্ম-সামাজিকতা-সংস্কৃতির নান্দনিকতায় সিক্ত-শুদ্ধ নাব্য নদী কর্ণফুলী। কাপ্তাই বাঁধের পরে বহুমাত্রিক নির্যাতন নিপীড়নকে আপন অঙ্গে, আপন জলে মাখিয়ে নিয়ে নিরবে নির্লিপ্ত, নিরবধি বঙ্গোপসাগরের পানে বয়ে চলা নদী কর্ণফুলী। প্রাণে প্রাণে, গানে গানে, ঘাটে ঘাটে মানুষের মাঝে সংহতিক,সম্প্রীতি-সংযুক্তির বন্ধন রচনা করে বয়ে চলা পাহাড়ি নদী কর্ণফুলী।

মিঠা ও মিশ্র পানির জল-বাস্তুতান্ত্রিকতার অনন্য সরোবর এই কর্ণফুলী। প্রায় তিন শতাধিক ছোট-বড় শিল্প বিড়ম্বনার নির্যাসকে আপন অঙ্গে ধারণ করে সাগর পানে ছুটে চলা নদী কর্ণফুলী। অভিযোগ অনুযোগহীন নির্বাক নিরুত্তর নদী কর্ণফুলী।

চট্টগ্রাম মহানগরীর ষাট লাখ নগর বাসীর দৈনিক উৎপন্ন প্রায় পাঁচ হাজার টন পয়বর্জ্য ধারন করে এই নদী। প্রতি বছরের সাড়ে তিন হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ এবং পাঁচশ' বা ততোধিক কন্টেইনার জাহাজের জাহাজ ধোয়া পানির নির্যাস গিলে এই নদী। সাত হাজার সাম্পানের অদৃশ্য বর্জ্য, দেড় হাজার ছোট জাহাজ, শতাধিক অয়েল ট্যাংকারের পোড়া তেল, ফার্নেস অয়েল, তেল-পানির মিশ্রণ, বর্জ্য তেল, শহরের প্রায় ১০ হাজার খাবার হোটেলের নির্যাস, মেডিকেল বর্জ্য, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সিংহভাগ তরল-কঠিন বর্জ্যের নির্যাস ৩০টি ছোট বড় খালের মাধ্যমে এই নদীকেই বহন করতে হয়।

এভাবেই অপশিল্পের আবর্জনা, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পয়ভার  বর্জ্য বহন করে করে নদীটির স্বকীয়তা হানি হয়েছে, শ্রীহীনতা ঘটেছে। বাস্তুতান্ত্রিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে নদীটি। নদীতে উপরের দিকে চর পড়েছে, প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নদীর স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যে, প্রাকৃতিকতা ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

সভ্যতার তথাকথিত নির্যাস বহন করে করে নদীটি যখন হাঁপিয়ে উঠেছিল, তখনই বিশ্বমহামারী করোনা তার ক্ষণস্থায়ী রাজত্ব শুরু করলো। মানুষের সব অর্জন, অহঙ্কারকে ছাপিয়ে করোনার তাণ্ডব মানুষকে যখন ঘর বদ্ধ করে ফেললো, তখনই নদীটির সাময়িক মুক্তি মিলল। আনন্দঘন প্রকাশ ঘটল। পানির বর্ণ, ছন্দ, গন্ধ, সুষমা, প্রাকৃতিকতা ফিরে এল।

দীর্ঘ সময় মানুষের ক্রিয়াকর্ম নিয়ন্ত্রিত, সীমিত। শিল্প কারখানা কালোধোঁয়া সীমিত। তরলবর্জ্য  নিঃসরণ সীমিত। নদী সংশ্লিষ্ট চট্টগ্রাম মহানগরীর রাস্তাঘাটগুলো যানবাহনের কালো ধোঁয়ার বিড়ম্বনা থেকে কিছুটা স্বস্তিতে। মহানগরের চিরচেনা উৎস থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে না । নদীতে দৈনন্দিন অভ্যাসগত বর্জ্য  মিশছে না। সবমিলিয়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড যখন সীমিত, স্তিমিত- তখনই প্রকৃতি বিকশ।

চারিদিকে শুদ্ধতার নির্মল পরশ। সুকান্ত নির্মল নীল আকাশ সবুজের সাথে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। প্রশান্ত সবুজের বিশুদ্ধ পরিবেশ বিকশিত হচ্ছে। প্রকাশিত হচ্ছে, প্রস্ফুটিত হচ্ছে যেন, 'মুক্ত নীলাম্বরে  অচ্ছায়  আলোক গাহে বৈরাগ্যের  স্বরে যে ভৈরবী গান।'

গাছে গাছে পাখ-পাখালির মৃদুমন্দ গুঞ্জরণে সকাল-সন্ধ্যা মুখরিত থাকছে। অনেকটাই ধুলাবালিমুক্ত আকাশ। স্বাচ্ছন্দ্যের  মহানগরী। বাতাসে  পিএম২.৫ এর পরিমাণ ৬০ থেকে ৮০ এর ভিতর। গত কয়েকদিন আগেও যা ৬০ এর নিচে অবস্থান করেছে। পাশাপাশি অনেকটাই স্বচ্ছ নির্মল জলের কর্ণফুলীর বয়ে যাওয়া পাহাড় থেকে সাগরের দিকে। নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জলের ভাসমান কনার পরিমাণ সামান্য। ইলেকট্রিকেল কন্ডাক্টিভিটি মান স্বাভাবিক মাত্রায়। পানির অ্যালকালিনিটি আগের চেয়ে কম। পানির প্রবেশ্যতা বেশি। অম্লত্ব,  ক্ষারকত্বের বাড়াবাড়ি নেই। পানির মানের এসব ধনাত্মক পরিবর্তনে প্রাকৃতিকতা আছে, পরিচ্ছন্নতার বার্তা আছে। স্বাচ্ছন্দ্যের বোধ আছে, সুখ ও  তৃপ্তি অনুভব আছে। করোনা বিপর্যয়ের মাঝেও শান্তির বার্তা আছে। এ যেন অচেনা এক নির্মল সবুজের স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশের জীবন্ত সুখানুভূতি।

কর্ণফুলীতে মাঝে মাঝে ডলফিন ভেসে উঠছে, খেলা করছে। পানিতে জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভেসে উঠছে। নদীকে জীবন্ত সত্তা মনে হচ্ছে। পানিতে জীবনের সুখ ও ছন্দ ভেসে উঠছে। নদীকে জীবনের অঙ্গ অংশ,  মনে হচ্ছে। নদীর দুই তীরে নির্মল সবুজ বৃক্ষরাজি যেন নদীর বয়ে চলাকে স্বাগত জানাচ্ছে। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন জীবন ফিরে পাচ্ছে। ছন্দ ফিরে পাচ্ছে। এই ছন্দের সাথে বাতাসের মদুমন্দ প্রশ্বাস জীবনকে বাহিত করছে। এ যেন প্রাণের ছোঁয়ায় নির্মল বাতাসের গুঞ্জনের ছন্দ প্রতিবেশ।

করোনার বিপর্যয় মানুষকে ঘর বন্ধ করেছে। একদিন করোনা মানুষের কাছে পরাজয় বরণ করবে। মানুষের জীবনের দামে করোনাকে পরাজিত করবে। মানুষ আবারও স্বাচ্ছন্দ্যের পৃথিবীতে নিজস্ব প্রভাব, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ব্যবহার করে পরিবেশকে, পরিবেশের উপাদানকে, নদী, সাগর, পাহাড়, আকাশ, বাতাসকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

হয়তো পরিবেশের আজকের সবুজ আবার বিপদগ্রস্ত হবে। আবার হারিয়ে ফেলবে তার স্বকীয়তা রং রহস্য, কোমলতা। নদী আবার তার পানির রং, প্রবাহ, স্বাচ্ছন্দ হারিয়ে ফেলবে। আমরা আবারও দাপিয়ে পরিবেশকে শাসন করব, জীবনকে, ভবিষ্যৎকে পিছনে ফেলে, জীবিকার জন্য, স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য। কিন্তু বাতাসের গন্ধে, প্রকৃতির মুক্তির ছন্দে যে স্বাচ্ছন্দ্য, জীবনের যে নির্ভরতা, আত্মার যে  মুক্তি, তা হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। নদীর স্বচ্ছ প্রবাহের যে মিনতি, সবুজের নির্মল বিকাশের যে ঝঙ্কার, আত্মিক বোধ, পাখির কলকাকলিতে মুখরিত জীবনের যে আহ্বান, তা হয়তো আবার হারিয়ে যাবে।

আবার হয়তো এমন দৃশ্য, এমন  জীবন ছোঁয়া  প্রকৃতি, নদী, পাখি, আকাশ, গাছপালা প্রতিবেশ পরিবেশের জন্য অন্যকোন মহাবিপর্যয়ের করোনাকালের অপেক্ষায় মানুষকে থাকতে হবে। নদীর আত্মা হয়ে, পরিবেশের প্রাণ হয়ে বিকশিত হোক আগামীর প্রতিটি মানবসত্তা।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, গবেষক

আরও পড়ুন

×