ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

ধান-চাল ক্রয়ের সুবিধা কৃষক পাবে তো?

ধান-চাল ক্রয়ের সুবিধা কৃষক পাবে তো?
×

কাসমির রেজা

কাসমির রেজা

প্রকাশ: ১০ মে ২০২০ | ০৪:৩২ | আপডেট: ১০ মে ২০২০ | ২৩:৪২

অনেক কষ্টে ফসল ফলিয়ে কৃষক যখন ন্যায্য দাম পান না তখন তাদের অনেকেই চেষ্টা করেন সরকারি গুদামে ধান দিতে। কিন্তু তাদের বেশির ভাগই তা পারেন না। প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে মধ্যস্বত্বভোগী দালাল ফরিয়ারা সুবিধা নিতে তৎপর হয়। সহজ সরল কৃষক তাদের সাথে পেরে উঠেন না। বছরের পর বছর তাই হয়ে আসছে। তবু সরকার যখন এ কার্যক্রম শুরু করে কৃষক আশায় বুক বাঁধেন। এবারও বোরো মৌসুমে সরকার ধান চাল কেনা কার্যক্রম শুরু করেছে।

এবার করোনা ভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক সংকটের কালে কৃষক কি পেরে উঠবে দালালদের সাথে? নাকি এবারও কৃষকের বাড়া ভাতে ছাই দিবে অসাধু চক্র?

সরকারিভাবে ধান চাল ক্রয়ের প্রধানত তিনটি উদ্দেশ্য থাকে। কৃষকরা যাতে তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পান, ধান চালের বাজার যেন স্থিতিশীল থাকে এবং দেশে যাতে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্যের মজুদ থাকে। তবে যে উদ্দেশ্যে সরকার এই কর্মসূচি হাতে নেয় তা কতটুকু সফল হয়? দেখা গেছে সরকারি এই কার্যক্রম থেকে কিছুটা সুফল মিললেও কিছু পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে এই কার্যক্রম পুরোপুরি সফল হতে পারছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল ফরিয়ারাই এই কার্যক্রম থেকে লাভবান হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই খাদ্যমন্ত্রণালয় জানিয়েছে চলতি বোরো মৌসুমে ৬ লাখ মেট্রিক টন ধান, সাড়ে ১১ লাখ মেট্রিন টন আতপ ও সেদ্ধ চাল এবং ৭৫ হাজার মেট্রিক টন গম কিনবে সরকার। ৩৬ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল, ৩৫ টাকা কেজি দরে ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল এবং ২৬ টাকা কেজি দরে ৬ লাখ মেট্রিক টন ধান কিনবে সরকার। চলতি মাসের ২৬ এপ্রিল থেকে ধান ও ৭ মে থেকে চাল সংগ্রহ শুরম্ন হবে এবং সংগ্রহ শেষ হবে ৩১ আগষ্ট। এছাড়া ২৮ টাকা কেজি দরে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ১৫ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৭৫ হাজার মেট্রিক টন গম কেনা হবে।

এবার ২৬ এপ্রিল থেকে সরকার বোরো মৌসুমে ধান চাল কেনার কার্যক্রম শুরু করার কথা থাকলেও এখনো তা শুরম্ন হয়নি। হাওরে ধার দেনা করে ফসল ফলানো কৃষক দ্রুত ঋণ পরিশোধ করতে কম দামে ধান বিক্রি শুরু করেছেন। খাদ্য মন্ত্রণালয় এখনো কৃষকের তালিকাই করেনি।

সরকারিভাবে প্রতিবছর ধানের চেয়ে চাল বেশি কিনা হচ্ছে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ধান বিক্রি করে থাকে কৃষকরা। আর চাল বিক্রি করে থাকে মিল মালিকরা। তাহলে সরকার যে অধিক পরিমাণ চাল কিনছে তার সুফল সরাসরি পাচ্ছে মিল মালিকরা। তাই সরকারকে চালের পরিবর্তে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে। সরকার যেভাবে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনছে সেই প্রক্রিয়ায়ও রয়েছে জটিলতা। এখানেও মধ্যবিত্ত, ফরিয়া ও দালালদের দৌরাত্ম্য সুস্পষ্ট। গত বছর থেকে সরকার লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা শুরম্ন করেছে। এতে আশার সঞ্চার হয়েছিল যে অন্ত্মত দালালদের দৌরাত্ম্য কমবে। কিন্তু এক্ষেত্রেও জটিলতা থেকে যায়। প্রথমত দেখা যায় লটারি তে যেসব কৃষকের নাম উঠেছে তারা এখন আর কৃষক নন। বা তারা আদৌ কখনো কৃষক ছিলেন না। কিন্তু তাদের কৃষি কার্ড রয়েছে। তাই লটারিতে নাম উঠার পর ওইসব তথাকথিত কৃষকদেরকে খুঁজেও পাওয়া যায়নি। হয়তো তারা শহরে বসবাস করছেন বা অন্য কোথাও ব্যবসার কাজে ব্যস্ত আছেন। তাই এই কৃষি কার্ড প্রকৃত কৃষকের কিনা সেটি নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

এজন্য কৃষি কার্ড কার্যক্রমকে নিয়মিত হালনাগাদ করা দরকার। দ্বিতীয়ত দেখা যায় লটারিতেও প্রভাবশালীরা তাদের প্রভাব খাটাচ্ছেন। সেটা যেন তারা না করতে পারেন সেজন্য আইনশৃপখলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এখন যেহেতু সেনাবাহিনীর সদস্যরা টহলরত আছেন, তাদের একজন প্রতিনিধি লটারির সময় উপস্থিত থাকলে স্বচ্ছতা বাড়বে।

কৃষকরা ধান সরকারিভাবে বিক্রি করতে গিয়ে আরো যেসব জটিলতার মধ্যে পড়েন তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কৃষকের ধানের আদ্রতা বেশি বলে অনেক সময় কৃষকদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। অনেকেই বলেন এটি অজুহাত মাত্র। এই অজুহাতে মধ্যসত্বভূগীরা ফায়দা লুটতে চেষ্টা করে। এ থেকে বাঁচার জন্য খাদ্য গুদাম গুলোতে যেন আদ্রতা কমানোর মেশিন রাখা হয়। বেসরকারি গুদামে এসব মেশিন রাখা হয়। কৃষক সরকারি গুদামে ধান দিতে আসলো আদ্রতা কমানোর জন্য যন্ত্রের সাহায্যে প্রয়োজনে আর্দ্রতা বেশি হলে আর্দ্রতা কমিয়ে নেয়া হবে। তবুও যেসব কৃষক ন্যায্য ভাবে ধান বিক্রি করার কথা তারা যেন সরকারি গুদামে ধান দিতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষকদের অসন্তুষ্টি রয়েছে ধানের দাম নিয়েও। এক মণ ধান ফলাতে কৃষকের যে খরচ হয় বাজারে ধান বিক্রি করে সে খরচে তাদের অনেক সময় উঠে না। তারপরও কৃষকরা ধান ফলায় এবং লোকসান দিয়ে বাজারে বিক্রি করে থাকে। আর ক্ষুদ্র কৃষকরা তো ভেজা দান আরো কম মূল্যে বিক্রি করে। অনেকেই লগ্নি করে টাকা এনে আগেই খরচ করে ফেলেন। এরা আরো কম দামে ধান বিক্রি করেন। এর মধ্যে সরকার যদি কম দামে ধান কিনে তবে তাদের আর কোথাও যাওয়ার উপায় থাকলো না। গত বছর সরকার ১ হাজার ৪০ টাকা দামে ধান কিনেছে। এবারও ১০৪০ টাকা দাম নির্ধারণ করা হলো। প্রতিবছর জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে এবং সেই অনুপাতে গতবছর যে দামে ধান কেনা হয়েছিল এই বছর তার চেয়ে একটু বেশি দামে ধান কিনা হবে সেটা বুঝার জন্য রকেট সাইন্টিস্ট হতে হয়না। কিন্তু আমাদের কর্তাব্যক্তিরা সেটিও যেন বুঝলেন না।

গতবছর গড়পড়তা ৬ ভাগের কাছাকাছি মুদ্রাস্ফীতি ছিল। সেই গড়পড়তা হিসেবে ছয় ভাগ যদি মূল্যবৃদ্ধি ধরা হয় এ বছর ধানের মূল্য হওয়ার কথা ১১০০ টাকার বেশি। কিন্তু এবারও গত বছরের দামই নির্ধারণ করা হলো। এদিক থেকেও কৃষক ঠকছেন।

বেশি দামে ধান কেনা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় এতে চালের দাম বেড়ে যেতে পারে। চালের দাম বাড়লে আবারো নিম্নবিত্ত মানুষ সংকটে পড়বে। অবশ্যই চালের দাম বাড়লে নিম্নবিত্তরা সংকটে পড়বেন। কিন্তু চালের দাম কেন বেশি সে হিসেব কি আমরা কষেছি? কৃষকরা গড় পড়তা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করেন। সেই হিসাবে পরিবহন খরচ সহ কেজি প্রতি চাল ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু সাধারণ ভোক্তারা সেই চাল কিনছেন ৪২ থেকে ৫৫ টাকা দামে। অর্থাৎ বাজারে এই চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এই দাম বাড়ানোর জন্য দায়ী মধ্যস্বত্বভোগী ফরিয়া দালালরা। তাই চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারের এখানে অনেক কিছু করার আছে। দেশের চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় ৫০টি বড় চাল কল মালিক। এদেরকে নিয়ন্ত্রণের মাঝে আনতে পারলেই চালের দাম অনেকটা কমে যাবে। তাই চালের দাম বেড়ে যাবে এই অজুহাতে কৃষকের কাছ থেকে অধিক দামে ধান না কেনা অনেকটা নিজের অদক্ষতা কে প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল। আর সরকারের কাছে যদি অনেক বেশি মজুদ থাকে তখন বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে। তখন হয়তো চালের দামও সেভাবে বাড়বে না। তাই কৃষককে আর একটু বাড়তি দামে ধান বিক্রির সুযোগ করে দেওয়া এবং সরকারিভাবে আরো অধিক পরিমাণে ধান কেনা দু'টিই অসম্ভব নয়। প্রয়োজন সদিচ্ছা ও সুন্দর একটি ব্যবস্থাপনা।

সরকার যদি ধান চাল কিনে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে চায় বা কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চায় তাহলে সরকারকে উলেতখযোগ্য পরিমাণ ধান চাল কিনতে হবে। কিন্তু সরকার যে পরিমাণ ধান কিনে তা শতকরা হিসাবে খুবই নগণ্য। সুনামগঞ্জের কথাই যদি ধরি এবছর সুনামগঞ্জের প্রায় ১৫ লক্ষ টন ধান উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারিভাবে ধান কেনা হচ্ছে প্রায় ২৬ হাজার টন। শতকরা হিসাবে তা ২ ভাগেরও কম। যদি ধান-চাল মিলিয়ে ধরি তবেও সেই হারটা চার ভাগের কমই থাকে। এত অল্প সংখ্যক ধান চাল কিনে বাজারকে সেভাবে প্রভাবিত করা যায় না। অন্যদিকে চালকল মালিকদের হাতেও দেশের চালের বাজার জিম্মি থেকে যায়। তাই আরো অধিক পরিমাণ ধান-চাল সরকারিভাবে ক্রয় করা জরুরি। এক্ষেত্রে বরাবরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে সমস্যাটির কথা বলা হয় সেটি হলো তাদের পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ করার গোদাম নেই। সেটিরও একটি সমাধান আছে। সরকার চাইলে কৃষকের ভাড়ারে তাদের ক্রয়কৃত ধান রাখতে পারে। সেজন্য কৃষকের সাথে আইনগতভাবে ডিড হতে পারে। বা সামান্য পরিমাণ অর্থ বাকি রাখা যেতে পারে যা ধান সরকারের কাছে বুঝিয়ে দেয়া সাপেক্ষে পরিশোধ করা হবে।

এখন আমাদের সরকারের সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। যার দরুন কৃষকের কাছ থেকে ৫, ৬ হাজার কোটি টাকার ধান কিনলে সরকার খুব বড় সমস্যায় পড়বে না। আর এটি তো সম্পদ কিনে রাখার মতোই। এই অর্থ তো আর বিনষ্ট হচ্ছে না। উল্টো বাফার স্টক স্কীমের মতো সরকার প্রয়োজনে স্টক থেকে বিক্রি করতে পারবে। এতে বাজারের উপরেও সরকারের অধিক নিয়ন্ত্রণ থাকে। কমে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য।

অর্থনীতিবিদরা যে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মহামন্দার আভাস দিচ্ছেন তা থেকে বাঁচতে হলে সৃষ্টি করতে হবে পর্যাপ্ত চাহিদার। বাজারে চাহিদা বাড়াতে হলে মানুষের হাতে থাকতে হবে অর্থ। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে অধিক পরিমাণে ধান কিনলে কৃষকের হাতে অর্থ থাকবে। যা বাজারে চাহিদা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। এতে সরকারি ত্রাণেরও চাহিদা কমবে। এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে কৃষির উপর গুরম্নত্ব দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। অধিক পরিমাণে ধান চাল কেনা হতে পারে এই ধেয়ে আসা অর্থনৈতিক মহামন্দা থেকে মুক্তির একটি অন্যতম উপায়।

লেখক: সভাপতি, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা

[email protected]





আরও পড়ুন

×