করোনাকালে সংবাদমাধ্যমের জন্য করণীয়
সোহেল হায়দার চৌধুরী
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২০ | ১৩:২২ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
কভিড-১৯ বা নভেল করোনাভাইরাসে দেশের বিপর্যস্ত অর্তনীতিকে চাঙ্গা রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসক-কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্যও প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। তাকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা। অন্যান্য খাতের মতো গণমাধ্যমের জন্য প্রণোদনার দাবি জানিয়েছিল মালিকদের বিভিন্ন সংগঠন এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলো। কিন্তু ঘোষিত আর্থিক সহায়তা প্রণোদনায় সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকদের বিষয়ে কোনো সুষ্পষ্ট ঘোঘণা বা নির্দেশনা নেই।
আমরা কেউই জানিনা যে করোনা পরিস্থিতি কতদিন থাকবে বা এর গতিপ্রকৃতি কি হবে। এ অবস্থায় সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং কর্মীদের সহায়তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতা একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও দৈনন্দিন জরুরি সেবামূলক পেশা হলেও সংবাদমাধ্যমকর্মীরা চিরকালই বঞ্চনার শিকার। তবুও দেশ ও জাতির প্রয়োজনে, মানবতার কল্যাণে সংবাদমাধ্যমকর্মীরা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে কাজ করেন।
ঠিক এই মুহূর্তে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বে করোনাভাইরাসের ব্যাপক আতঙ্ক। একদিকে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে নানা গুজব দেশব্যাপী ভেসে বেড়াচ্ছে। দেশ-বিদেশে বসে কিছু মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব বা অখ্যাত কোনো অনলাইনে গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে; যার কারণে সরকার যেমন বিতর্কের মুখে পড়ছে, তেমনি সামাজিক অস্থিরতাও কমবেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসময় যদি মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের প্রকাশনা ও প্রচার বন্ধ রাখত বা সাংবাদিকরা নিরাপত্তার কথা ভেবে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশন বন্ধ রাখতেন, তাহলে গুজবের ডালপালায় ভাসতো পুরো দেশ। করোনায় আক্রান্তের পাশাপাশি গুজব আক্রান্ত রাষ্ট্রে পরিণত হতো বাংলাদেশ। অথচ সংবাদকর্মীরা সুরক্ষিত না থেকেও তাদের কাজটি করে চলেছেন।
এরই মাধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দুই সংবাদকর্মী হুমায়ুন কবির খোকন ও মাহমুদুল হাকিম অপু চিরবিদায় নিয়েছেন। আরও অনেক সংবাদকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন বা করেছেন। আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করেও সংবাদকর্মীরা তথ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। করোনাভাইরাসের থাবা দিনে দিনে বিস্তৃত হতে চললেও অনেক সাংবাদিকের সামগ্রিক নিরাপত্তা, দৈনন্দিন চাহিদাটুকুও হুমকির মুখে। অনেক প্রতিষ্ঠানেই সংবাদকর্মীদের একাধিক মাসের বেতন বাকী। বাসা থেকে আসা-যাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও করেনি অনেক প্রতিষ্ঠান। কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের পরিবহণ সুবিধা দিলেও গাদাগাদি করে আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে। তাতে ব্যাহত হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব।
এই সঙ্কটকালে হাতেগোণা ক’টি প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারিদের শারিরীক বা আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। প্রথম আলো, ইত্তেফাক, সমকাল, ডেইলি স্টার, বাংলাট্রিবিউন, বিডিনিউজ, জাগোনিউজসহ কিছু সংবাদপত্র ও ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার নাম এক্ষেত্রে বলা যায়। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের চিত্রই উদ্বেগজনক। অথচ সরকার বা তথ্য মন্ত্রণালয় চাইলে এ বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত ও নজরদারির মাধ্যমে সংবাদকর্মীদের আরও সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নিতে পারত। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সুরক্ষা পদ্ধতি নিশ্চিত করা হয়েছে কিনা বা এই সঙ্কটকালে সংবাদকর্মীরা তাদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পাচ্ছেন কিনা তা নজরদারি জরুরি ছিল। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে শুধু হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছাড়া সুরক্ষার আর কোনো পদ্ধতি নেই। আর্থিক বা মানসিক সুরক্ষাও তথৈবচ।
সংবাদপত্রের জন্য সরকার ওয়েজ বোর্ড ঘোষণা করলেও টেলিভিশন চ্যানেল বা অনলাইন কর্মীরা এখন পর্যন্ত কোনো আইনি বেতন কাঠামো পাননি। সংবাদপত্রের ওয়েজ বোর্ড সুবিধা হাতেগোণা কিছু সংবাদপত্র ও বার্তা সংস্থার সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারিরা পেয়ে থাকেন। চাকরি ছেড়ে দিলে বা চাকরিচ্যুত হলে সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারিদের অধিকাংশই তার ন্যায্য সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত হন। এই পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ মালিক আর সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারিদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে প্রণোদনা বা বরাদ্দ ঘোষণা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রণোদনার ক্ষেত্রে দেখতে হবে প্রকৃত সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারিরা সেটা সঠিকভাবে পাচ্ছেন কিনা। এজন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব নিতে হবে। সরকার প্রকৃত এবং সক্রিয় সংবাদমাধ্যমকে প্রণোদনা দিতে পারে দুই প্রক্রিয়ায়-
১. প্রতিষ্ঠান চালু রাখার জন্য মালিকদের প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে নামমাত্র সুদের হার রাখা যেতে পারে। স্বল্পসুদের এই ঋণ শুধুমাত্র সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহার করার শর্ত জুড়ে দেয়া যেতে পারে।
২. সরকার চাইলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে থাকা পত্রিকার বিজ্ঞাপণ বিল একটি সময় বেঁধে দিয়ে পরিশোধের ব্যবস্থা করতে পারে। এই বিজ্ঞাপণ বিল প্রাপ্তির পরে পত্রিকা মালিকেরা সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারিদের বেতন পরিশোধ করলেন কিনা তা মনিটর করতে হবে তথ্য মন্ত্রণালয়কে।
৩. টেলিভিশন বা প্রকৃত ও সক্রিয় অনলাইন বার্তা সংস্থা, নিউজ পোর্টালগুলোর জন্য কোনো ওয়েজ বোর্ড বা আইনি বেতন কাঠামো না থাকায় ক্ষেত্রটিতে অনেক সঙ্কট বিদ্যমান। এখানেও একই প্রক্রিয়ায় প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে।
৪. রাজধানীর সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্নস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে।
৫. সংবাদমাধ্যমে (সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন বার্তা সংস্থা বা নিউজ পোর্টাল) কর্মরত প্রকৃত ও সক্রিয় সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারিদের প্রত্যেককে থোক বরাদ্দ দেয়া দরকার। সেজন্য বিভিন্ন সংবাদপত্র ও অন্যান্য মাধ্যমে কর্মরত সর্বস্তরের সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বচ্ছ তালিকা সংগ্রহ এবং সেটি যাচাই-বাছাই করে সঠিক ব্যক্তির হাতে বরাদ্দের অর্থ তুলে দিতে হবে।
৬. প্রধানমন্ত্রীর দেয়া এই বরাদ্দের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বেতনের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। অর্থাৎ মালিক তার প্রণোদনার অর্থ থেকে বেতন দেবেন। এটি হবে সংবাদকর্মীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহার।
৭. সক্রিয় সাংবাদিকদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অবহেলা-বঞ্চনার শিকার হয়ে বা বয়সের কারণে সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ আজ কর্মহীন। এই শ্রেণিটিকেও বরাদ্দ দিতে হবে। এদের তালিকা তৈরি করার জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে।
৮. দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা সাংবাদিকদেরও এই বরাদ্দ প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে হবে। তাদেরও তালিকা তৈরি করে বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন।
প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের একটি দল প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেবে। টেলিভিশন চ্যানেল বা অনলাইনের ক্ষেত্রেও একইরকম পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে সংবাদকর্মীদের জন্য বরাদ্দের অর্থ যেন সম্মানজনক হয় সেটিও সরকারকে মনে রাখতে হবে। একইসঙ্গে আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, কোনো নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান নয়, নিয়মিত প্রকাশিত বা প্রচারে থাকা, জনবল কাঠামোভিত্তিক প্রকৃত সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে প্রণোদনা এবং বরাদ্দ দিতে হবে।
একথা সত্যি যে, বঙ্গবন্ধুকন্যা সাংবাদিকদের জন্য একটি কল্যাণ ট্রাস্ট করে দিয়েছেন। এই ট্রাস্টে তিনি সিডমানিও দিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে অনেক সাংবাদিকের আবাসন ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে বেতন-ভাতা নিয়ে সাংবাদিকদের বঞ্চনা ও অসহায়ত্বের অবসান ঘটানোও জরুরি। আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)