ভালোবাসা, দুঃখে, প্রাপ্তিতে নজরুল
ড. প্রতিভা রানী কর্মকার
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২০ | ২৩:৫৮ | আপডেট: ২৫ মে ২০২০ | ০০:০১
জীবন-মৃত্যুর মাঝে সবচেয়ে মধুর বা সবচেয়ে কষ্টের যে অমৃত বা গরল আমরা পান করি সেটা ভালোবাসা, যা কাউকে হাসায়, কাউকে কাঁদায়, কাউকে ভাবায়; কিন্তু কাউকে হারায় না। ভালোবাসার এই চিরন্তন সত্যকে যিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন আর তার অমূল্য লেখনী দিয়ে আলোকিত করেছেন বাংলা সাহিত্যের অপূর্ণ জগৎ, জাগিজীবন-মৃত্যুর মাঝে সবচেয়ে মধুর বা সবচেয়ে কষ্টের যে অমৃত বা গরল আমরা পান করি সেটা ভালোবাসা, যা কাউকে হাসায়, কাউকে কাঁদায়, কাউকে ভাবায়; কিন্তু কাউকে হারায় না। ভালোবাসার এই চিরন্তন সত্যকে যিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন আর তার অমূল্য লেখনী দিয়ে আলোকিত করেছেন বাংলা সাহিত্যের অপূর্ণ জগৎ, জাগিয়ে তুলেছেন হৃদয়ের অব্যক্ত কথামালা, রাঙিয়ে দিয়েছেন শূন্য হৃদয় তিনি আমাদের প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)।
অসংখ্য লেখায় নজরুলের বহুমুখী প্রতিভা দীপশিখা হয়ে পথ প্রদর্শন করেছে সাহিত্যপ্রেমী হৃদয়। এত ভালোবাসা, এত প্রেম, এত অভিমান, এত গভীর বেদনায় হৃদয়ের অব্যক্ত বেদনার অনিন্দ্য বহিঃপ্রকাশ নজরুলের পক্ষেই সম্ভব ছিল। কাজী নজরুল ইসলাম-এর প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য লেখা 'রাজবন্দীর চিঠি'। এ চিঠিতে তিনি ছিলেন লেখক শ্রী ধূমকেতু হিসেবে। ধূমকেতুর মতো তিনি পৃথিবীর আকাশে মহাজাগতিক অতিথি হিসেবে ঔপনিবেশিক সময়ের ব্রিটিশ দখলদার শোষক-নিপীড়ক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিবাদ করেছেন, দৃশ্যমান হয়েছেন উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে যা আজও দেদীপ্যমান।
কাজী নজরুল ইসলামকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে কলকাতা নিয়ে এসে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়েছিল। তিনি ছিলেন বিচারাধীন বন্দী এবং তার বিচার হয়েছিল প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে। এ মামলার শুনানির শেষ পর্যায়ে কাজী নজরুল ইসলাম যে অসামান্য বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেটি আমরা জানি 'রাজবন্দির জবানবন্দি' হিসেবে। নার্গিসকে লেখা চিঠিটি ছিলো রাজবন্দির জবানবন্দির একটি অংশ। নার্গিসকে লেখা কাজী নজরুল ইসলামের এ চিঠি যেন প্রকৃতি, প্রেম ও অতৃপ্ত প্রেমিক হৃদয়ের অব্যক্ত বেদনার কথা। অনেক সময় চিঠিতে যে বেদনার কথা, হৃদয়ের বাণীর কথা বলা যায় বাস্তবে হয়তো মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেটা বলা যায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রীর পত্রে মৃণাল যেভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন স্বচ্ছ আয়নার মত নজরুলের চিঠিতেও সেভাবে সেদিন নার্গিসের জন্য তার হৃদয়ের গভীর ক্ষত, অসীম বেদনা, প্রেম ও বিদ্রোহের পরিস্ফুটন হয়েছিল। সেদিন সদ্য বর্ষার নবঘন-সিক্ত প্রভাতে কবির হৃদয়েও অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল।
বাহিরের ঝড় বর্ষা দেখা যায় কিন্তু মানুষের মনের ভেতরের অনেক অজানা কষ্ট বাহিরের কেউ কেউ দেখতে পায় না। এই আষাঢ় কবিকে কল্পনার জগৎ থেকে মুক্তি দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো অনন্ত এক জগতে যেখানে সত্য প্রকাশে বাধা নেই, নেই আত্মিক টানাপোড়েন। কবি নার্গিসকে লিখেছিলেন, "যাক, তোমার অনুযোগের অভিযোগের উত্তর দেই। তুমি বিশ্বাস করো, আমি যা লিখছি তা সত্য। লোকের মুখে শোনা কথা দিয়ে যদি আমার মূর্তির কল্পনা করে থাকো,তাহলে আমায় ভুল বুঝবে- আর তা মিথ্যা।" যে হাত হৃদয়ের কথা ফুটিয়ে তুলতে পারে সদ্য ফোটা ফুলের মতো করে সে কি কখনো কোনো জিঘাংসা হৃদয়ে পোষণ করতে পারে ? পারে না। কবির হৃদয়ে যে বেদনার আগুন ছিল তাতে তিনি নিজেই পুড়ে দগ্ধ হয়েছেন, তা দিয়ে নার্গিসকে কোনোদিন দগ্ধ করতে চাননি।
ভালোবাসার এ যেন মাতৃরূপ । ভালোবাসা ও জীবন পাশাপাশি বহমান নদীর মতো, একদিন সাগরে মিলন হবেই। নার্গিসের সেদিনকার রূপ নিয়ে নজরুল তাই বিচলিত হন নি, তবে কষ্ট পেয়েছেন । যাকে দেবীমূর্তির মতো তার বিশাল হৃদয় বেদীতে অনন্ত প্রেম, অনন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন সেদিনের সে ভুল করে সে বেদী গ্রহণ না করলেও নজরুল আজীবন তাকে ভালোবেসে ক্ষমা করেছেন। তিনি জানতেন তাকে পাওয়ার বাসনা একদিন তার প্রিয়ার মধ্যেও জাগবে তাই সেদিন বলেছিলেন, "তুমি যদি সত্যিই আমায় ভালবাস আমাকে চাও ওখান থেকেই আমাকে পাবে। লাইলি মজনুকে পায়নি, শিরি ফরহাদকে পায়নি, তবু তাদের মত করে কেউ কারো প্রিয়তমাকে পায়নি।”
নজরুলের দুঃখ বোঝার মতো, বিশালতার আকৃতি কল্পনা করার ক্ষমতা তার কল্পনার রানীর নার্গিসের হয়তো ছিল না। নার্গিসকে বলে যাওয়া বাণী আজও আমাদের মধ্যে যারা পথভোলা তাদের পথ দেখায়, তার কথায় যে দৃপ্ততা দেখি সেটা বিস্ময়কর , "মানুষ ইচ্ছা করলে সাধনা দিয়ে, তপস্যা দিয়ে ভুলকে ফুল রূপে ফুটিয়ে তুলতে পারে। যদি কোনো ভুল করে থাক জীবনে, এই জীবনেই তাকে সংশোধন করে যেতে হবে; তবেই পাবে আনন্দ মুক্তি; তবেই হবে সর্ব দুঃখের অবসান"। সত্যি, পৃ্থিবীর সকল ভালোবাসা, দুঃখে, প্রাপ্তিতে নজরুল এক অপূর্ব মূর্তিতে চিরকাল স্মরণীয়।
লেখক: পরিচালক ও সহযোগী অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা