ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

সব স্তরে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দিন

সব স্তরে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দিন
×

ড. হাসান মাহমুদ রেজা

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২০ | ০২:০১ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

একদিকে মরণঘাতি করোনাভাইরাস আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে, অন্যদিকে চলছে অনুমোদনহীন কিছু ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। দুটোই মারাত্মাক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ভালো-মন্দ বিচার না করে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা চলছে এসব ওষুধ দিয়ে। কভিড-১৯ রোগীদের বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে অনুমোদনহীন এসব ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে। বিভিন্ন স্তরে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ছে।

আমরা জানি, কোন ওষুধ বাজারে আনার আগে বেশি কিছু কঠিন ধাপ পার করতে হয়। যথাযথ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষে নিদিষ্ট রোগের বিপরীতে নিদিষ্ট মাত্রায় কোন একটি ওষুধ বাজারজাতকরণের অনুমোদন লাভ করে। এর বাইরে অন্য কোন রোগে একই ওষুধ ব্যবহার করতে হলে পুনরায় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করা অত্যাবশ্যকীয়।

কভিড-১৯ চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিনিয়ত চিকিৎসা পদ্ধতি প্রণয়ন করছে। বাংলাদেশেও ন্যাশনাল গাইড লাইনস অন ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব কভিড-১৯ এই রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করছে যা অনুসরণ করইে একজন চিকিৎসকের করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে এ নিয়ম চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে।

যেহেতু কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য এখনো পর্যন্ত কোন ওষুধ বা প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এ রোগের চিকিৎসায় বিদ্যমান বিভিন্ন ওষুধের ট্রায়াল চলছে সব দেশেই। আর এসকল ট্রায়ালের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে কিছু কিছু ওষুধ রোগীদের উপর জরুরি সাময়িক প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে অনেকগুলো ট্রয়ালের ফলাফল বিবেচনায় এনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হচ্ছে। ওষুধ প্রয়োগের বেলায় এটিই নির্ধারিত পন্থা যখোনে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টেও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখজনকভাবে ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট কমিটিতেও কোন গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নেই ।

পরিতাপের বিষয় যে, কভিড-১৯ চিকিৎসায় একটি পরজীবিনাশক ওষুধ এবং একটি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ একরকম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। করোনা আক্রান্তের সামান্যতম উপসর্গ থাকলেই বিনা টেস্টে এসব সন্দেহজনক ব্যাক্তিদের এই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে; যা মোটেও বিজ্ঞান সম্মত নয় বা সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতির আওতায় পড়ে না। যদি এ দুটি ওষুধ সত্যিকার অর্থে কার্যকর হয়, তবে সেটি দ্রুত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব। তারপরেই ব্যবহারের সাময়িক অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। বিদেশ থেকেও কিছু কিছু চিকিৎসক কোন নিয়মতান্ত্রিক গবেষণার সূত্র না ধরেই একরকম নিজের মনগড়া চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রয়োগের কথা বলছে। গণমাধ্যমেও সেটি প্রচার করা হচ্ছে। ওষুধ প্রয়োগের ব্যাপারে এধরণের প্রচার কতটা আইনসঙ্গত তা ভেবে দেখা দরকার। কেননা এধরনের প্রচারণা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। আর যেহেতু আমাদের দেশে ফার্মেসিগুলোতে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট থাকে না, ফলে সহজে প্রেসক্রিপশন ছাড়া যে কেউ এ ওষুধগুলো কিনে খেয়ে মারাত্মাক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে করোনা আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৮০ ভাগ কবেল শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়েই এ ভাইরাসের মোকাবেলা করতে পারে। তাই ঢালাওভাবে সামান্য উপসর্গ দেখামাত্রই উল্লেখিত ওষুধ প্রয়োগ মোটেও যুক্তিসংগত নয়। আর এভাবে ওষুধ প্রয়োগে অর্জিত ফলাফলের ভিত্তিতে বলা যায় না যে, ওষুধ দুটি কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে কার্যকরী। কেননা সুর্নিদিষ্ট পরীক্ষা পদ্ধতি এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি।

বাংলাদেশে নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত ফার্মেসীর সংখ্যা দুই লক্ষাধিত। এ ফার্মেসিগুলোতে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের বিক্রয় চলছে অবাধে। নেই কোন কার্যকারী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। শুধু নিয়ম-নীতি তৈরি করে সেবাখাত উন্নত করা যায় না। উদাহারণস্বরূপ, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিয়ে একটি নীতিমালা আছে কিন্তু সেটি কতটুকু মেনে চলছে এদেশের জনগণ? প্রেসক্রিপশন ছাড়াই এগুলি বিক্রি হচ্ছে এবং একটি ভোগ্য পণ্যের মতই এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এভাবেই দিন দিন অ্যান্টিবায়োটিকগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক এর বেশির ভাগই আর কাজ করছে না আগের মত। অদক্ষ, অশিক্ষিত সেলসম্যান নিয়ে পরিচালিত ফার্মেসিগুলোই এর জন্য বেশি দায়ী। একজন গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টই কেবল চিকিৎসাসেবার মানকে নিশ্চিত করতে পারে।

দেশে প্রতিটি কমিউনিটিতে প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা একাধিক কমিউনিটি ফার্মেসি স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট মূল দায়িত্ব পালন করবে। যেহেতু রোগীরা সব সময় ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে পারে না। তাই সাধারণ স্বাস্থ্য-সমস্যা নিয়ে তারা একজন গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে। একজন সাধারণ সেলস্ম্যানের কাছ থেকে এহেন চিকিৎসা পরামর্শ বা সেবা গ্রহণ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক, যা মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে।

উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের হাসপাতালগুলোতে ড্রাগস্ অ্যান্ড থেরাপিউটিক্স কমিটি এবং বিভিন্ন সাব-কমিটিততে হসপিটাল ফার্মাসিস্ট থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বারংবার, স্বাস্থ্যসেবায় গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগের কথা আলোচিত হলেও দেড় হাজারের বেশি হাসপাতালে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ এখনো সম্ভব হয়নি। কর্মক্ষম দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরির লক্ষ্যে এবং যথাযথ ওষুধের ব্যবহার নিশ্চিতকরণে সকল হাসপাতালে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগের বিকল্প নেই।

লেখক: প্রফেসর ও ডিন , স্কুল অব হেলথ্  অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস্, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন

×