ফিরে ফিরে আসে চে গুয়েভারা
ফকির আলমগীর
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২০ | ০০:১৪ | আপডেট: ১৪ জুন ২০২০ | ০০:২৩
আজ ১৪ জুন ২০২০ চিরচেনা বিপ্লবী চে গুয়েভারার শুভ জন্মদিন। ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্মগ্রহণ করেন পৃথিবীর মানুষের প্রিয় মুখ আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। আর ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর নিরস্ত্র অবস্থায় নয়টি গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল বন্দি চে গুয়েভারাকে। 'নতজানু হয়ে সারা জীবন বাঁচার চেয়ে আমি এখনই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত'- এটি কিংবদন্তি বিপ্লবী চে গুয়েভারার বিখ্যাত উক্তি। আজ বিপ্লবী চে'র জন্মদিন। আজ যখন বিপ্লবী চে স্মরণে নিবন্ধ লিখছি, ঠিক তখন সারা বিশ্ব করোনা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তার ওপর জর্জ ফ্লয়েড হত্যায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে সারাদেশ। শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তার হাতে জর্জ ফ্লয়েড নামের কৃষ্ণাঙ্গের নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্দোলন, বিক্ষোভে ফুঁসছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত ২৫ মে ঘটনা ঘটার পর থেকে বিক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে শহরে, দেশ থেকে দেশান্তরে। সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে এ লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন দেশের সেলিব্রেটি শিল্পীরা। ইতোমধ্যে আমিও জর্জ ফ্লয়েডকে সম্মান জানিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার প্রতিবাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে প্রখ্যাত গীতিকার কবির বকুলের কথায় 'কি আমার বর্ণ, কি আমার ধর্ম, আমি কৃষ্ণাঙ্গ নাকি শ্বেতাঙ্গ, থাকবে কেন এই বৈষম্য, আমি মানুষ, মানুষ হয়েই জন্ম' গণসংগীতটি ইউটিউব চ্যানেলে অবমুক্ত করেছি। আন্দোলন দমনের নিষ্ঠুরতা আমেরিকার চেহারাকেই (পুরোনো) মনে করিয়ে দেয়।
আজন্ম বিপ্লবী চে গুয়েভারাকে স্মরণ করে তাই আমার লেখা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে চে গুয়েভারা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজন্ম চিরচেনা বিপ্লবীর পুনর্জন্ম যেন প্রতি বছরে। তার মৃত্যু নেই। তবু জেগে আছে অমর প্রাণ, চে গুয়েভারা তার নাম। অজেয় তুমি অমর তুমি পৃথিবী তোমাকে ভোলে নাই। তোমারই চেতনায়, প্রেরণায় চারিদিকে চলছে আজও বাঁচার লড়াই। যেখানে মুক্তির মহাসংগ্রাম, বিপ্লব, বিক্ষোভ, যুদ্ধ, রক্তধারা চেয়ে দেখি সেখানে জেগে আছে চে গুয়েভারা। পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, চে গুয়েভারা কেমন করে সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠল। ৯ অক্টোবর ১৯৬৭ সাল। বলিভিয়ার সেনাবাহিনী দম্ভ করে ঘোষণা করল, তারা হত্যা করতে পেরেছে চে গুয়েভারাকে। হাত, পা বাঁধা অবস্থায় একে একে নয়টি গুলি চালিয়ে আর্জেন্টাইন সেই নিরস্ত্র সন্ত্রাসীকে মেরে ফেলতে পেরেছে এক মদ্যপ সৈনিক। বলিভিয়া সেনাবাহিনীর এমন মহাসাহসী কর্মকাণ্ডে উল্লসিত, আনন্দিত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী গণমাধ্যম সেদিন লিখেছিল, একজন মানুষের সঙ্গে সঙ্গে একটি মিথ বা রূপকথা চিরতরে বিশ্রামে চলে গেল। সেদিনের সেই লেখক-সাংবাদিক আজ বেঁচে থাকলে লজ্জায় তার মুখ লুকাতেন। কারণ সেই মানুষটি আসলে মরেনি, মরেনি তার মতাদর্শ, তার বিপ্লবী চেতনা। খোদ ইউরোপ, আমেরিকা, বলিভিয়া, কিউবা, আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা, কানাডা, ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে নেপাল, ভারত, চীন এমনকি বাংলাদেশ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষের দিনবদলের স্বপ্ন হয়ে আছে অমর চে গুয়েভারার আদর্শ, তার মিথ। চে গুয়েভারা আজও তাই বিপ্লবের প্রতীক।

ব্যক্তি বা মানুষ চে মারা গেছেন পাঁচ দশকের বেশি সময় আগে। কিন্তু আমরা আজও বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, তিনি আরও বেশি করে মানুষের অপ্রাপ্তি, শোষণ, বঞ্চনা, হত্যা, রাহাজানির, নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নতুন শক্তি হিসেবে সবাইকে সাহস জোগাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, আবার যেন আজন্ম বিপ্লবীর পুনর্জন্ম হচ্ছে। তিনি যেন বার বার ফিরে ফিরে আসছেন বিপ্লবে। কারণ আর্জেন্টিনায় বা লাতিন আমেরিকায় এখন তাকে সত্যিকার অর্থেই অনুস্মরণ করা হচ্ছে। চে গুয়েভারাকে জীবন্ত রাখার জন্য সবচেয়ে বড় কাজটি করেছেন তার বন্ধু ও বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। সেই ফিদেল কাস্ত্রোকেও মাত্র কয়েক বছর আগে আমরা হারিয়েছি। এক্ষেত্রে পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে মেপিকো সিটিতে চের সঙ্গে কিউবান বিপ্লবীদের প্রধান নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে পরিচয় হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে কিউবার বিপ্লবী দলে নাম লেখালেন আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি হাভানার নিয়ন্ত্রণ নিল ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী সরকার। আর ২ জানুয়ারি হাভানায় পৌঁছলেন বিপ্লবী চে গুয়েভারা। ওই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারিই চে কিউবার নাগরিকত্ব পেলেন। অক্টোবরে দেশের কৃষি পুনর্গঠনের রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রধান হিসেবে চে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আর রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেলেন নভেম্বরে। ১৯৬৫ সালের ১ এপ্রিল ফিদেল কাস্ত্রোকে লিখলেন বিখ্যাত সেই বিদায়পত্র। নিজেকে সব প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিয়ে পরিবারের দায়িত্ব কিউবা রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন কঙ্গোর উদ্দেশে। ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বলিভিয়া সেনাবাহিনী ঘিরে ফেলল চে এবং তার ছোট একটি গেরিলা দলকে। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রেনে বেরিয়েন্তোস চে'কে হত্যা করার আদেশ দিলেন। সে প্রসঙ্গ আমি পূর্বেই আলোচনা করেছি। চে গুয়েভারার জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হচ্ছে কিউবা বিপ্লব ও কিউবার মন্ত্রিত্ব। কিউবার মন্ত্রিত্ব তাকে আজও আলোচনায় রেখেছে। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সালে তিনি কিউবার শিল্পবিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। তিনি ফিদেল কাস্ত্রোকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, কূটনীতি এবং অধ্যবসায়ের কথা জানিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, চে গুয়েভারা গ্রেনেড তৈরির কারখানা, রুটি সেকার জন্য চুল্লি তৈরি এবং নিরক্ষর সঙ্গীদের লেখাপড়ার জন্য পাঠশালা তৈরি, স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন, তথ্য সরবরাহের জন্য পত্রিকা প্রচার করতেন। সেই কারণে বিখ্যাত টাইমস ম্যাগাজিন তিন বছর পর তাকে কাস্ত্রোর মস্তিস্ক বলে আখ্যায়িত করেছিল। তারপর চে'র মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দেয়। বুলেট স্বাধীনতার যোদ্ধাকে হত্যা করে। কিন্তু তার ভাবধারা, তার স্বপ্ন কে নয়। তাই তো চে'র পদচিহ্ন আজও প্যাটাগোমিয়া থেকে রিওগ্রান্ডের অগণিত জনতাকে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখায়। আজও দেশে দেশে আন্দোলন-সংগ্রামের যে বসন্ত সেখানে দেখি চে গুয়েভারার ছবি সংগ্রামের প্রতীক হয়ে তারুণ্য উজ্জীবিত হয়। তাই তো বিশ্বকে জাগিয়ে দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড চিরনিদ্রায় শায়িত হন। বর্ণবাদের প্লেগমুক্ত হোক বিশ্ব। জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ড কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটি বর্ণবাদী হত্যাকাণ্ড। 'ন্যায়বিচার শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হতেই থাকে। পুলিশি বর্বরতায় যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার ঘটনা আসলে বর্ণবাদী ঘটনা। যেদিন ফ্লয়েড ন্যায়বিচার পাবেন, সেদিন সত্যিকার অর্থে যুক্তরাষ্ট্র সব বর্ণের মানুষের সমান বিচার নিশ্চিতের পথে এগিয়ে যাবে। আজ তাই বিবর্ণ পৃথিবীতে, আন্দোলন-সংগ্রামক্ষুব্ধ পৃথিবীতে চে গুয়েভারার অভাব আমরা অনুভব করি।
লেখক: গণসংগীত শিল্পী
- বিষয় :
- ফকির আলমগীর
- চে গুয়েভারা
- চতুরঙ্গ