একজন ‘বিনয়ী কামরান’ ও কিছু স্মৃতি
বদর উদ্দিন আহমদ কামরান
মিনহাজুল ইসলাম জায়েদ
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২০ | ০৫:১৫ | আপডেট: ২২ জুন ২০২০ | ০৫:৪৭
সরকারি মুরারী চাঁদ কলেজে সম্মান প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে বসবাসের উদ্দেশ্যে সিলেট শহরে প্রথম পা রাখি ২০০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তবে সে সময়ে নিয়মিত থাকা হয়ে উঠেনি। মাঝেমধ্যে এসে দু্'চার দিন হাজিরা দিয়ে আবার চলে যেতাম। ২০০১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে আবাসিক ছাত্র হিসেবে ছাত্রাবাসে উঠার পর থেকে সিলেটে নিয়মিত অবস্থান শুরু করি।
পরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সহপাঠী কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিলে ছাত্রাবাস থেকে 'সিঁড়ি' নামক একাট সাহিত্য সাময়িকি প্রকাশ করা হয়। সাময়িকির জন্য বাণী সংগ্রহ ও সিটি কর্পোরেশনের বিজ্ঞাপন আনতে বন্ধু বিএম আবুলকে (বর্তমানে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, রূপালী ব্যাংক, সুনামগঞ্জ কর্পোরেট শাখা) সঙ্গী করে এক সকালে হাজির হই তৎকালীন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের বাসায়। তার বিনয়, সদাচরণ ও সদালাপী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সর্ম্পকে আগে থেকে অবগত হলেও এটাই ছিল তার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ।
ছাত্রাবাসের অনেকেই এমনকি আমাদের এই উদ্যোগের সাথে জড়িত অন্য বন্ধুরাও পরামর্শ দিয়েছিল যেহেতু আমাদের সাথে তার কোন পূর্ব পরিচয় নেই তাই উনার সাথে সম্পর্কীত কারো মাধ্যম হয়ে যেন আমরা দেখা করি। তাদের সেই পরামর্শ কর্ণপাত না করে আমরা সরাসরি চলে যাই। আমরা যখন পৌঁছাই তখনো তিনি বৈঠকখানায় আসেননি। অথচ এরইমধ্যে অনেক মানুষের সমাগম হয়ে গেছে।
শয়নকক্ষে বসে নৈশকালীন পোশাক পরেই তিনি সবার আবদার পূরণ করছিলেন। পরিচয় দিয়ে আমাদের বিষয়টি উত্থাপন করলে তিনি খুব খুশি হয়ে আমাদেরকে এমন উদ্যোগ নেয়ার জন্য অভিবাদন জানান। অনেককেই এ ধরনের সহায়তা করতে বিধায় আমাদের দাবীর অর্ধেক পরিমাণ আর্থিক সহায়তা অনুমোদন করে কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জমা দেয়ার অনুরোধ জানান। আর মেয়রের বাণী লেখার দায়িত্ব বর্তান আমাদের ওপর। চা পান না করিয়ে আসতে দেননি। সম্পূর্ণ অপরিচিত আমাদের সাথে এমন আন্তরিক আচরণ একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল।
আমরা যখন চায়ের অপেক্ষায় সে সময়ে হাতে লেখা একটি আবেদনপত্র নিয়ে হাজির হন এক বয়স্কা মহিলা। গায়ের পরিধেয় জানান দিচ্ছিল নিম্নবিত্ত পরিবারের সাধারণ একজন। 'মা' সম্বোধন করে মেয়র মহোদয় জানতে চান তার সমস্যার কথা। মহিলা হাতের আবেদনপত্রটি দিয়ে তাতে সুপারিশের অনুরোধ করেন। পত্র পড়ে মেয়র সঠিকভাবে লেখা হয়নি মন্তব্য করে তাকে বসার অনুরোধ জানান। মহিলা অল্পক্ষণ পরে চলে যান। কিছুক্ষণ পরেই মহিলাকে না দেখে তার লোকদেরকে তাকে খুঁজে আনার নির্দেশ দেন। তাদের একজন উনাকে রাস্তা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। পুনরায় তাকে 'মা' সম্ভোধন করে মেয়র জানতে চান তিনি কেন চলে যাচ্ছিলেন। প্রতিত্তোরে মহিলা বলেন, আবেদনপত্র ঠিক হয়নি বলে তিনি স্বাক্ষর না করায় ফিরে যাচ্ছিলেন। মেয়র উত্তর দেন আবেদন সঠিক হয়নি বলেছি; কিন্তু ফিরে যেতে বলিনি। অতঃপর, তার সহকারীকে ডেকে আবেদনটি সঠিকভাবে লিখে দেবার নির্দেশ প্রদান করেন।
পুরো ঘটনাটি স্বচক্ষে দেখে মনে হয়েছে, একজন সিটি মেয়র তার কোন নাগরিকের সাথে নয়, যেন কথা বলছেন জননীর সাথে। ফিরতি পথের পুরোটাই এই ঘটনাটি নিয়ে আমরা বিশ্লেষণ করেছি। অনেক সময় গ্রামের একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের সাথেও সাধারণ জনগণ এতটা কাছ ভীড়তে পারে না। অথচ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা সম্পন্ন হয়েও তার দ্বার ছিল সবসময় সবার জন্য উন্মুক্ত।
পরবর্তীতে ছাত্রাবাসে থাকাবস্থায় সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লে অনেকবার তার বাসা ও নগরভবনে যাওয়া হয়েছে। ছাত্র জীবন শেষে সিলেটে প্রায় অর্ধদশক সাংকাদিকতাকালে পেশাগত দায়িত্ব পালনে বহুবার তার সাথে সাক্ষাত হয়েছে। সর্বদা তার বিনয়ী স্বভাব, সদাচারণে মুগ্ধ হয়েছি।
সিলেটের সাংবাদিক মহলে উল্লেখযোগ্য সব রাজনৈতিক দলের অনুসারী রয়েছেন। রাজনৈতিক নেতা কিংবা নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে সাংবাদিকের অনেকে বদর উদ্দিন কামরানের বিরোধী হলেও ব্যক্তি কামরানের বিরোধী কেউ ছিলেন না। একইভাবে নগরবাসীর অনেকেই রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তার প্রতিপক্ষ হলেও ব্যক্তি কামরানের কোন প্রতিপক্ষ ছিলো না। অমায়িক আচরণ, সদালাপ, বিনয় আর ভদ্রতার আভরণে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন সমগ্র সিলেটবাসীকে। তাই নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের হলেও মানুষ হিসেবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন 'জনতার কামরান'।
বদর উদ্দিন কামরান মহান জীবনই গঠন করে গেছেন, যার ফলে গোটা সিলেটবাসী আজ তার শোকে মুহ্যমান। দল, মত, জাতি, ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই তার প্রয়াণে কাতর। মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে আকুল আবেদন মানুষ হিসেবে বদর উদ্দীন কামরানের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো গাফফার নামের খাতিরে মার্জনা করে তিনি যেভাবে মানুষকে আপন করে নিয়েছিলেন, এভাবে পরলৌকিক জীবনে ক্ষমাশীল আল্লাহ যেন তাকে আপন করে জান্নাতের অতিথি হিসেবে গ্রহণ করে নেন।
লেখক: সিনিয়র সহকারী সচিব